ব্লু অ্যাকশন কানাডা তাদের বিশেষায়িত 'ব্লু ইকোনমি' বা সমুদ্র-নির্ভর অর্থনীতির স্টার্টআপগুলোর জন্য দ্বিতীয় দফার আবেদন গ্রহণ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রোগ্রামটি মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগগুলোর বিকাশে কাজ করে এবং এটি কানাডার প্রথম এক্সিলারেটর হিসেবে পরিচিত যা সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রকেন্দ্রিক উদ্যোগগুলোর ওপর আলোকপাত করে। উপকূলীয় অবকাঠামো থেকে শুরু করে দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি পর্যন্ত বিভিন্ন উদ্ভাবনী সমাধান এই প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত।
এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটি ভিক্টোরিয়ার 'কোস্ট' (COAST), লন্ডনের বিখ্যাত ভেঞ্চার স্টুডিও 'ফাউন্ডার্স ফ্যাক্টরি' এবং বাহামা-ভিত্তিক সমুদ্র হাব 'ব্লু অ্যাকশন'-এর মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া মূল ব্লু অ্যাকশন এক্সিলারেটরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এই কানাডিয়ান সংস্করণটি চালু করা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি 'ওশান সুপারক্লাস্টার'-এর কৌশলগত সমর্থন লাভ করেছে, যা কানাডার সামুদ্রিক উদ্ভাবন খাতে নতুন গতির সঞ্চার করছে।
দ্বিতীয় দফার এই কার্যক্রমে সর্বোচ্চ আটটি সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে নির্বাচন করা হবে, যারা চার মাসব্যাপী একটি নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এই প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য হলো পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সফলভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা। এই এক্সিলারেটরের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি অংশগ্রহণকারী স্টার্টআপগুলোর কাছ থেকে কোনো ইক্যুইটি বা মালিকানা অংশ দাবি করে না। এর পরিবর্তে, এটি উদ্যোক্তাদের ১০টি দেশের বিনিয়োগকারী, সরকারি সংস্থা এবং শিল্প নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা পাইলট প্রজেক্ট শুরু করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই দ্বিতীয় দফার জন্য বেশ কিছু অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে যা সমুদ্রের টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে:
- সামুদ্রিক পরিবহন এবং আধুনিক বন্দর প্রযুক্তি
- উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন
- প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
- প্রতিরক্ষা এবং দ্বৈত-ব্যবহারের (dual-use) উন্নত প্রযুক্তি
ওশান সুপারক্লাস্টারের এই সক্রিয় সমর্থন কানাডার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পদক্ষেপকে নির্দেশ করে। দেশটির লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে সমুদ্র-নির্ভর অর্থনীতি বা 'ব্লু ইকোনমি'-কে ২২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে ব্লু অ্যাকশন কানাডা বিজ্ঞান, আধুনিক উদ্যোক্তা মানসিকতা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি মিলনস্থল হিসেবে কাজ করছে, যা উদ্ভাবনকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়ক হবে।
ব্লু অ্যাকশনের প্রেসিডেন্ট রুপার্ট হেওয়ার্ড এই উদ্যোগ সম্পর্কে অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ব্লু ইকোনমিতে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত মূল উপাদান কানাডার হাতে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বমানের গবেষণা সুবিধা, গভীর সামুদ্রিক কারিগরি দক্ষতা এবং একটি দ্রুত বর্ধনশীল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম যা নতুন নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করছে।
আগ্রহী উদ্যোক্তাদের জন্য আবেদনের শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই নিবিড় প্রোগ্রামটি ২০২৬ সালের মে মাসে সমাপ্ত হবে। বিশেষ বিষয় হলো, এই সমাপ্তি অনুষ্ঠানটি ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বখ্যাত 'ওয়েব সামিট'-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আয়োজন করা হবে, যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।
বর্তমান বিশ্বে সমুদ্রকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং একে উন্নয়নের এক অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ব্লু অ্যাকশন কানাডা প্রযুক্তি এবং প্রকৃতির মধ্যে সহযোগিতার সেই সেতুবন্ধনকে আরও মজবুত করছে, যেখানে প্রতিটি উদ্ভাবন জন্ম নেয় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং দায়িত্ববোধ থেকে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা নতুন করে শিখছি কীভাবে সমুদ্রের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। এটি কেবল একটি ব্যবসায়িক কর্মসূচি নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছানোর একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সমুদ্রের সাথে এই রেজোন্যান্স বা অনুরণনই আমাদের ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়নের পথ দেখাবে।



