একটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অ্যান্টার্কটিক সমুদ্রের বরফের ঘনত্বের পরিবর্তনের সাথে দক্ষিণ আমেরিকার দাবানলের একটি গভীর ও আগে অজানা সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। নতুন পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য এবং গাণিতিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি দেখা গেছে যে, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের কাছে সমুদ্রের বরফের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব-মধ্য অঞ্চলে দাবানলের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই আবিষ্কারটি বিশ্ব জলবায়ু ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দূরবর্তী প্রভাবক প্রক্রিয়াকে উন্মোচিত করেছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের গতিপ্রকৃতি কীভাবে অনেক উত্তরের আবহাওয়া এবং পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এই দূরবর্তী প্রভাবটি মূলত অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের কাছাকাছি এলাকায় বরফের ঘনত্ব বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক ঘূর্ণি বা 'এডিস' (eddies)-এর মাধ্যমে কাজ করে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। এই সামুদ্রিক আলোড়নগুলো পরবর্তীকালে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ওপর একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং শক্তিশালী উচ্চ-চাপ বলয় তৈরি করতে সহায়তা করে। এই ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় বিন্যাস দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়, যার মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা, বাতাসের নিম্ন আর্দ্রতা এবং বায়ুপ্রবাহের তীব্র গতিবেগ। GFDL-CM2.1 মডেল এবং ERA-Interim রিঅ্যানালাইসিস ডেটা ব্যবহার করে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যান্টার্কটিক সমুদ্রের বরফের (ASI) পরিমাণ এবং আয়তন বৃদ্ধি দক্ষিণ আমেরিকার ঋতুভিত্তিক বৃষ্টিপাত ও বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
মেরু অঞ্চল এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের মধ্যে এই জটিল মিথস্ক্রিয়া বর্তমান জলবায়ু বিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এর আগে বিজ্ঞানীরা মূলত আর্কটিক বা উত্তর মেরুর বরফ কীভাবে উত্তর গোলার্ধের মধ্য-অক্ষাংশের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে তা নিয়ে অনেক বেশি গবেষণা করেছেন। তবে এই নতুন বিশ্লেষণটি জোরালোভাবে বলছে যে, দক্ষিণ গোলার্ধের ক্রায়োস্ফিয়ার বা বরফমন্ডলও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা হয়তো এতদিন বিজ্ঞানীদের কাছে কিছুটা রহস্যময় ছিল। এই নতুন আবিষ্কৃত প্রক্রিয়াটি মেরু অঞ্চল থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রভাব বিস্তারের একটি পথ দেখায়। এটি এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ENSO)-এর মতো পরিচিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় প্রভাবগুলোর ঠিক বিপরীতমুখী একটি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে।
দক্ষিণ আমেরিকার সুনির্দিষ্ট কিছু বায়ুমণ্ডলীয় ব্যবস্থা এই অ্যান্টার্কটিক বরফের পরিবর্তনের ফলে সরাসরি প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আটলান্টিক কনভারজেন্স জোন (South Atlantic Convergence Zone) এর ক্রমবিকাশ এবং বলিভিয়ান হাই (Bolivian High)-এর শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় ১১০ থেকে ১২০ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে। বিশেষ করে ব্রাজিলের আমাজন এবং দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিল অঞ্চল এই ধরনের জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বরফের পরিবর্তনের পর দাবানলপ্রবণ আবহাওয়া শুরু হওয়ার আগে কৃষি ও বন বিভাগকে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ আমেরিকায় বন উজাড়ের ফলে নির্গত কার্বনের প্রায় অর্ধেকই আসে এই ভয়াবহ দাবানল থেকে।
এই আবিষ্কারটি পৃথিবীর জলবায়ুর আন্তঃসংযুক্ত এবং সংবেদনশীল প্রকৃতিকে আবারও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। এটি দেখায় যে দক্ষিণ মহাসাগরের পরিবর্তনগুলো, যেমন সমুদ্রের বরফের বিস্তৃতি (যা ২০১৬ সালের আগে বৃদ্ধি পেলেও পরে দ্রুত হ্রাস পেয়েছে), বায়ুমণ্ডলীয় সংযোগের মাধ্যমে স্থলভাগের চরম আবহাওয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার কৃষি এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর জন্য এই যোগসূত্রটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল জলবায়ু পরিস্থিতির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বা ওজোন স্তরের পুনরুদ্ধারের মতো অন্যান্য বৈশ্বিক প্রভাবকগুলোর তুলনায় এই মেরু অঞ্চলের প্রভাব ঠিক কতটা শক্তিশালী, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চ-রেজোলিউশন জলবায়ু মডেলিংয়ের প্রয়োজন হবে।


