পেরুতে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার প্রমাণগুলো এখন প্রকাশ পাচ্ছে।
২০২৫ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক একটি দল পেরুর বিখ্যাত নাজকা রেখার নিচে পূর্বে অজ্ঞাত এক বিশাল ভূগর্ভস্থ নগরীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। এই সনাক্তকরণটি পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দ্বারা উন্নত গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার (GPR) প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ভূগর্ভস্থ স্থাপত্য কাঠামোটি ভূপৃষ্ঠের জিওগ্লিফগুলি তৈরিরও আগের, যা ইঙ্গিত দেয় যে নাজকা অঞ্চলে পূর্বে অনুমান করা সময়ের চেয়ে শত শত বছর আগে একটি উন্নত সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছিল। নাজকা রেখাগুলি, যা প্রায় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দে নাজকা সংস্কৃতি দ্বারা নির্মিত, ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। এই নতুন আবিষ্কার নাজকা অঞ্চলের ঐতিহাসিক সময়রেখাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রাথমিক মানচিত্রাঙ্কন অনুযায়ী, এই ভূগর্ভস্থ জটিল কাঠামোটি কয়েক বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যেখানে সুড়ঙ্গ, কক্ষ এবং আপাতদৃষ্টিতে ধর্মীয় চত্বরের একটি জটিল নেটওয়ার্ক বিদ্যমান। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে নাজকা সংস্কৃতি তাদের পূর্বসূরি প্যারাকাস সংস্কৃতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল, বিশেষত জল ব্যবস্থাপনা এবং বস্ত্রশিল্পে। প্যারাকাস সংস্কৃতি প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল এবং তারা সেচ ও জল ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক জ্ঞান রাখত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক ডঃ এলেনা ভার্গাস উল্লেখ করেছেন যে স্থাপত্যে প্রাথমিক প্যারাকাস সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্য থাকলেও, এই অঞ্চলের জন্য এর ব্যাপকতা অভূতপূর্ব। নাজকা অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দারা জল সরবরাহের জন্য পুকিওস নামক ভূগর্ভস্থ জলপ্রণালী নির্মাণ করেছিল, যার মধ্যে কিছু আজও কার্যকর রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ স্তরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো অক্ষত মৃৎপাত্রের একটি সংগ্রহ, যেখানে নাজকা বা প্যারাকাস শিল্পকর্ম থেকে স্বতন্ত্র প্রতীক দেখা যায়। নাজকা সংস্কৃতির মৃৎশিল্পে কমপক্ষে ১২টি ভিন্ন রঙের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, যা প্যারাকাস সংস্কৃতির পরবর্তী-ফায়ারিং রজন চিত্রাঙ্কন থেকে প্রাক-ফায়ারিং স্লিপ চিত্রাঙ্কনে স্থানান্তরের মাধ্যমে চিহ্নিত। নাজকা রেখাগুলির চিত্রগুলি প্রধানত প্রাণী ও উদ্ভিদের, যেমন বানর (১১০ মিটার লম্বা) এবং হামিংবার্ড (৫০ মিটার লম্বা), যা মূলত আকাশ থেকে দেখার জন্য তৈরি। এই ভূগর্ভস্থ বসতির সঠিক উদ্দেশ্য এখনও এক গভীর রহস্য, যা বিশ্ব প্রত্নতাত্ত্বিক সম্প্রদায়গুলির মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গভীর স্তরগুলিতে প্রবেশ বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে, কারণ কাঠামোগত অখণ্ডতা মূল্যায়ন এবং বিশেষ সংরক্ষণ প্রোটোকল তৈরির কাজ চলছে। এই আবিষ্কারের প্রেক্ষাপটে, নাজকা রেখাগুলির সুরক্ষার জন্য পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল যখন তারা সুরক্ষিত এলাকা হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যদিও পরে তারা ৫,৬৩৩ বর্গ কিলোমিটারের মূল সীমানা পুনরুদ্ধার করে। এই ভূগর্ভস্থ নগরীর উন্মোচন প্রমাণ করে যে নাজকা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক গভীরতা ভূপৃষ্ঠের শিল্পকর্মের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত, যা ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।