একটি নতুন গবেষণা প্রমাণ দেয় যে অ্যান্টার্কটিক মাইক্রোবগুলি -২০°C পর্যন্ত তাপে বায়ু থেকে শক্তি লাভ করে।
পূর্ব আন্টার্কটিকার মাটির অণুজীবগুলো চরম প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক বিস্ময়কর ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-২০°সে) তাপমাত্রায়ও এই অণুজীবগুলো তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম সচল রাখতে পারে। এই বিশেষ প্রক্রিয়াটি 'অ্যারোট্রফি' (aerotrophy) নামে পরিচিত, যেখানে তারা বায়ুমণ্ডলে থাকা অতি সামান্য হাইড্রোজেন এবং কার্বন মনোক্সাইড অক্সিডেশনের মাধ্যমে শক্তি সংগ্রহ করে। মেরু অঞ্চলের দীর্ঘ অন্ধকার রাতে যখন সালোকসংশ্লেষণ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন এই অণুজীবগুলো প্রাথমিক উৎপাদক হিসেবে কাজ করে বাস্তুসংস্থানকে সচল রাখে।
এই আন্টার্কটিক প্রজাতির অণুজীবগুলোর মধ্যে এক অসাধারণ তাপসহনশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাদের এনজাইম সিস্টেম ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় সক্রিয় থাকতে সক্ষম। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অ্যারোট্রফিক প্রক্রিয়ার বিস্তার বিশ্বব্যাপী হাইড্রোজেন চক্রকে আমূল বদলে দিতে পারে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সঞ্চালিত মোট হাইড্রোজেনের প্রায় ৮২ শতাংশই এই ক্ষুদ্র অণুজীবগুলো গ্রহণ করে থাকে।
ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলস, ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ড এবং মোনাশ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ইতিপূর্বে নিশ্চিত করেছেন যে, এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর জিনগত কাঠামোতে এমন বিশেষ এনজাইম রয়েছে যা বাতাস থেকে হাইড্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড (CO) এবং কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) সংগ্রহ করতে পারে। তারা কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে জৈব অণু সংশ্লেষণ করে এবং কার্বন মনোক্সাইডকে অক্সিডেশনের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইডে রূপান্তর করে শক্তি উৎপাদন করে। সহজ কথায়, তারা যেন কেবল 'বাতাস খেয়ে' বেঁচে থাকে। জৈব পদার্থের চরম অভাব থাকা সত্ত্বেও এমন পরিবেশে টিকে থাকার এই কৌশলটি জ্যোতির্জীববিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রোবায়োলজির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা অন্য গ্রহের প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে জোরালো করে।
প্রতি বছর পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে প্রায় ৪০ থেকে ১৩০ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়। এই বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেনের স্থানান্তর এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অণুজীবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্পক্ষেত্রে হাইড্রোজেন উৎপাদনে যেখানে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়, সেখানে আন্টার্কটিকার এই অণুজীবগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় এবং সাশ্রয়ীভাবে হাইড্রোজেন ব্যবহার করে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি গ্রহের জৈব-রাসায়নিক চক্র বজায় রাখতে একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।
অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় কোষের ঝিল্লি বা মেমব্রেনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো তাদের লিপিড গঠনে পরিবর্তন আনে। তারা শর্ট-চেইন এবং অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড ব্যবহারের মাধ্যমে কোষকে তরল-স্ফটিক অবস্থায় রাখে। সাধারণত মাটির অন্যান্য অণুজীব +৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও, আন্টার্কটিকার এই অ্যারোট্রফগুলো তাদের বৃদ্ধি এবং বিপাকীয় কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এই অনন্য অভিযোজন ক্ষমতা অণুজীবের টিকে থাকার সীমা এবং বৈশ্বিক গ্যাসীয় ভারসাম্যের ওপর তাদের অদৃশ্য প্রভাব বোঝার জন্য একটি আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, আন্টার্কটিকার এই ক্ষুদ্র প্রাণসত্তাগুলো কেবল বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার উদাহরণ নয়, বরং তারা পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। তাদের এই 'বায়ুভোজী' স্বভাব এবং চরম তাপমাত্রায় টিকে থাকার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহাকাশে প্রাণের সন্ধানে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এই অণুজীবগুলোর জীবনচক্র এবং তাদের শক্তি আহরণের পদ্ধতি ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও সহায়ক হতে পারে।