ক্রান্তীয় বনের গহীন পত্রপল্লবে হঠাৎ করেই একটি বিশেষ চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়। একজন সাধারণ পথচারীর কাছে এটি পালের সাধারণ শোরগোল মনে হতে পারে, তবে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংকেতগুলো ফলের গাছের অবস্থান এবং ফলের পরিপক্কতা সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য বহন করে। মাকড়সা বানরেরা সম্ভবত এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থার অধিকারী যা তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সাহায্য করে এবং এই আবিষ্কারটি বন্যপ্রাণী জগতের সামাজিক বন্ধনের গভীরতা সম্পর্কে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, যেখানে টিকে থাকার জন্য জ্ঞানই হলো প্রধান চাবিকাঠি।
দক্ষিণ মেক্সিকো থেকে আমাজন অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত বনাঞ্চলে ‘অ্যাটেলিস’ বা মাকড়সা বানরদের বসবাস। অস্বাভাবিক দীর্ঘ হাত-পা এবং আঁকড়ে ধরার উপযোগী লেজ বিশিষ্ট এই প্রাইমেটরা তাদের সারা জীবন বনের ওপরের স্তরেই কাটায়, যেখানে তাদের প্রধান খাদ্য হলো ফল। তাদের এই আবাসস্থল অত্যন্ত পরিবর্তনশীল: সব গাছে একসাথে ফল ধরে না এবং পাকা ফলগুলো দ্রুতই প্রতিযোগীদের নজর কাড়ে। মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি দলের সফলভাবে টিকে থাকা মূলত নির্ভর করে এর সদস্যরা সম্পদের বিষয়ে কতটুকু দক্ষতার সাথে তথ্য আদান-প্রদান করছে তার ওপর এবং প্রাথমিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, এখানে নিছক প্রবৃত্তি ছাড়াও আরও উচ্চতর কিছু কাজ করছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে এই প্রাইমেটদের আচরণ নিয়ে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তাদের ডাক বা কণ্ঠস্বরের বৈচিত্র্য নথিভুক্ত করেছেন। এক ধরনের ডাক সম্ভবত নির্দিষ্ট স্থানে উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন পাকা ফলের উপস্থিতির খবর দেয়, আর অন্য ধরনের ডাক অপক্ব বা কম পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে যে, এই ‘আভ্যন্তরীণ জ্ঞান’ অভিজ্ঞ সদস্যদের কাছ থেকে নবীনদের মাঝে সঞ্চারিত হয়, যার ফলে পুরো দলটি তাদের শক্তি সাশ্রয় করতে পারে এবং ভুল এড়াতে সক্ষম হয়। এটি বিশেষ করে খাবারের সংকটের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তথ্যের সমন্বয় হওয়ায় দলের অভ্যন্তরে সংঘাত কমে যাওয়ারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই ধরনের আচরণ একটি বৃহত্তর পরিবেশগত ধরণ উন্মোচন করে: জটিল এবং পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে সামাজিক শিক্ষা কাজ করে। ক্রান্তীয় বন কেবল অগোছালো গাছের ভিড় নয়, বরং এটি সূক্ষ্ম ঋতুভিত্তিক ছন্দে পরিচালিত একটি ব্যবস্থা, যেখানে ফলের অবস্থান এবং পরিপক্কতার জ্ঞান একটি গুপ্তধনের মানচিত্রের মতো মূল্যবান। সম্ভবত হাজার হাজার বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার এই আদান-প্রদান গড়ে উঠেছে, যা ‘অ্যাটেলিস’ বানরদের বীজের বিস্তারকারী হিসেবে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থাগুলো কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বন উজাড় এবং আবাসের বিচ্ছিন্নতার কারণে মাকড়সা বানরের অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ছোট ও বিচ্ছিন্ন দলগুলোতে সঞ্চিত ‘আভ্যন্তরীণ জ্ঞান’ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে, কারণ এই ঐতিহ্যগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য পর্যাপ্ত সদস্য সংখ্যা এবং নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। পরিবেশগত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অ্যাটেলিস’-এর বেশ কিছু প্রজাতি বর্তমানে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং প্রাথমিক তথ্য বলছে যে, তাদের আবাসস্থল এভাবে হারিয়ে যেতে থাকলে শুধু তাদের খাবার জোগাড়েই বিঘ্ন ঘটবে না, বরং বনের পুনর্জন্ম প্রক্রিয়াও ব্যাহত হবে। কারণ বড় বড় গাছের বীজের বিস্তারে এই প্রাইমেটরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
মানব সমাজে যেভাবে বয়োজ্যেষ্ঠরা শিশুদের ভোজ্য উদ্ভিদ বা প্রকৃতির ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে থাকেন, তার সাথে এখানে একটি সমান্তরাল রেখা টানা সম্ভব। মাকড়সা বানরদের মধ্যেও যৌথ স্মৃতির একটি একই রকম নীতি কাজ করে, শুধু শব্দের বদলে সেখানে কণ্ঠস্বরের সূক্ষ্ম তারতম্য এবং আচরণ ব্যবহৃত হয়। আমাজন অঞ্চলের আদিবাসীদের একটি পুরনো প্রবাদ আছে— ‘গাছ তখনই শক্ত হয় যখন তার শিকড়গুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে’। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যেকোনো বাস্তুসংস্থানের স্থায়িত্ব নির্ভর করে এর বাসিন্দাদের মধ্যে অদৃশ্য বন্ধন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর।
প্রকৃতির এমন বুদ্ধিমত্তার ধরনগুলো বুঝতে পারা আমাদের ক্রান্তীয় বন এবং সেখানকার অধিবাসীদের সুরক্ষায় আরও সচেতন হতে সাহায্য করে।




