‘সাতোশি যুগের তিমি’র জাগরণ: ১৪ বছর পর ২,১০০ বিটকয়েনসহ ওয়ালেটের প্রথম লেনদেন

সম্পাদনা করেছেন: Yuliya Shumai

ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতের ইতিহাসে ‘সাতোশি যুগের’ বিনিয়োগকারীদের আচরণ সবসময়ই একটি রহস্যময় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি এই কৌতূহল আরও বেড়েছে যখন দেখা গেছে যে, ২০১২ সালের জুলাই মাস থেকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকা একটি বিটকয়েন ওয়ালেট ২০২৬ সালের ২০ মার্চ একটি পরীক্ষামূলক লেনদেন সম্পন্ন করেছে। এই ওয়ালেটটি এমন একজন বিনিয়োগকারীর, যাকে ক্রিপ্টো পরিভাষায় ‘তিমি’ বা হোয়েল বলা হয়। এই ওয়ালেটে বর্তমানে ২,১০০টি বিটকয়েন (BTC) জমা রয়েছে, যার বাজারমূল্য লেনদেনের সময় ছিল প্রায় ১৪৭ থেকে ১৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্লকচেইন ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় (UTC) ১০:২৭ মিনিটে এই ওয়ালেট থেকে একটি নতুন ঠিকানায় মাত্র ৪৭ থেকে ৫৬ ডলার সমমূল্যের একটি ক্ষুদ্র লেনদেন করা হয়েছে, যা মূলত ওয়ালেটটির কার্যকারিতা পরীক্ষার একটি অংশ।

এই বিশাল পরিমাণ বিটকয়েনের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ এবং এটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০১২ সালের জুলাই মাসে যখন এই ২,১০০ বিটকয়েন প্রথম কেনা হয়েছিল, তখন একটি বিটকয়েনের দাম ছিল মাত্র ৬.৫৯ ডলারের কাছাকাছি। সেই হিসেবে এই বিশাল সম্পদের পেছনে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩,৬৮৫ থেকে ১৩,৮১৮ ডলারের মধ্যে। বর্তমান বাজার মূল্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, এই বিনিয়োগকারীর অনাদায়ী মুনাফা বা আনরিয়ালাইজড প্রফিট ১,০০০,০০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে মূলধন সংরক্ষণের অন্যতম এক বিরল এবং সফল উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ বিটকয়েনের বাজার দর ৭০,৭০০ ডলার থেকে ৯২,০০০ ডলারের একটি বিশাল পরিসরে ওঠানামা করছিল, যা এই সম্পদের উচ্চ চাহিদাকেই ফুটিয়ে তোলে।

দীর্ঘদিনের পুরনো এবং নিষ্ক্রিয় ওয়ালেটগুলোর এমন হঠাৎ নড়াচড়া ট্রেডারদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তারা এই ধরনের প্যাটার্নগুলোকে বাজারের সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদী মূল্যের গতিবিধির সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ বড় হোল্ডারদের বিক্রির সিদ্ধান্ত বাজারের তারল্য এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই একটি লেনদেন মানেই যে মালিক তার সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে দেবেন, এমনটা ভাবা ভুল হতে পারে। এটি কেবল ওয়ালেটের মালিকানা নিশ্চিত করা কিংবা দীর্ঘ ১৪ বছর পর তার সিকিউরিটি কি বা সিড-ফ্রেজ পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। লক্ষ্যণীয় যে, এই স্থানান্তরটি পুরনো ‘পে-টু-পাবকি-হ্যাশ’ (P2PKH) ফরম্যাট ব্যবহার করে করা হয়েছে, যা মালিকের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সতর্ক এবং রক্ষণশীল পদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘটনাটি ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বড় বিনিয়োগকারীদের বা ‘তিমি’দের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার একটি বৃহত্তর চিত্রের অংশ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৮০,০০০ বিটকয়েন গ্যালাক্সি ডিজিটাল (Galaxy Digital)-এ স্থানান্তরিত হতে দেখা গিয়েছিল। এই ধরনের বিশাল স্থানান্তরকে সাধারণত বাজারে বড় ধরনের বিক্রির প্রস্তুতি বা সম্পদ বিতরণের সংকেত হিসেবে দেখা হয়। এর কিছুকাল পরেই, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ক্রিপ্টো বাজারে একটি ‘ফ্ল্যাশ ক্র্যাশ’ বা আকস্মিক ধস দেখা দেয়, যেখানে বিটকয়েনের দাম ১২০,০০০ ডলারের ওপর থেকে দ্রুত নেমে ১০২,০০০ ডলারে এসে দাঁড়ায়, যা বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাময়িক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।

বিটওয়াইজ (Bitwise)-এর প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ম্যাট হোগান এই বাজার পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, অক্টোবরের সেই ধসের পর বিটকয়েনের দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারার অন্যতম কারণ ছিল শুরুর দিকের বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে আসা বিক্রির চাপ। এই আর্লি ইনভেস্টররা তাদের বিশাল মুনাফা তুলে নেওয়ার মাধ্যমে বাজারের ঊর্ধ্বমুখী সম্ভাবনাকে এক প্রকার সীমিত করে দিয়েছিলেন। তবে বিটওয়াইজের বিশ্লেষকরা একই সাথে পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ইটিএফ (ETF)-এর মাধ্যমে আসা প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা বর্তমানে নতুনভাবে উৎপাদিত বিটকয়েনের ১০০ শতাংশের বেশি শোষণ করে নিচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেখা গেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী হোল্ডাররা ইতিমধ্যে ১১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি মুনাফা সংগ্রহ করেছেন এবং প্রায় ১,৬৫০টি বিটকয়েন বিক্রি করেছেন, যার মধ্যে ওয়েন গুন্ডেন-এর মতো পরিচিত বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বিটকয়েনের সরবরাহের সামগ্রিক গতিশীলতা বিবেচনা করলে এই ধরনের ঘটনাগুলো বাজারকে একটি রূঢ় বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। একটি হিসাব অনুযায়ী, বিটকয়েনের মোট সরবরাহের মধ্যে প্রায় ৪০ লক্ষ কয়েন চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়, যা কখনোই বাজারে ফিরে আসবে না। অন্যদিকে, আরও লক্ষ লক্ষ বিটকয়েন এমন সব ‘ডায়মন্ড হ্যান্ড’ বা দীর্ঘমেয়াদী হোল্ডারদের কাছে রয়েছে যারা সহজে তাদের সম্পদ বিক্রি করতে আগ্রহী নন, যা বাজারে বিটকয়েনের লভ্য সরবরাহকে অত্যন্ত সীমিত করে রাখে। বর্তমানে পুরো ক্রিপ্টো বিশ্ব অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে যে, এই ২,১০০ বিটকয়েন কি শেষ পর্যন্ত কোনো এক্সচেঞ্জে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাঠানো হবে, নাকি এগুলোকে আরও আধুনিক ও নিরাপদ কোনো কোল্ড ওয়ালেটে দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য সরিয়ে নেওয়া হবে।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Cointelegraph

  • Benzinga

  • TradingView

  • LatestLY

  • Cointelegraph

  • BITmarkets

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।