১১ মার্চ ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী, বিটকয়েন বাজারে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে, অন্যদিকে তাৎক্ষণিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয়গুলো সামনে আসছে। বর্তমানে এই ডিজিটাল সম্পদটি ৭০,০০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি দরে লেনদেন হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মধ্যে এর ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পট বিটকয়েন ইটিএফ-এ (ETF) পুঁজির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় রয়েছে। তবে এই স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বাজারে কিছু প্রযুক্তিগত দুর্বলতার লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিটওয়াইজ (Bitwise)-এর প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ম্যাট হোগান একটি অত্যন্ত আশাবাদী দীর্ঘমেয়াদী চিত্র তুলে ধরেছেন। হোগান ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, আগামী এক দশকের মধ্যে বিটকয়েনের মূল্য ১০ লক্ষ ডলারে পৌঁছাতে পারে। তার এই যুক্তির মূলে রয়েছে বৈশ্বিক 'স্টোর-অফ-ভ্যালু' (SoV) বা সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে বিটকয়েনের বাজার দখলের সম্ভাবনা। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে সোনা বা অন্যান্য সঞ্চয় মাধ্যমের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের, যেখানে বিটকয়েনের অংশ মাত্র ৪ শতাংশের কম (প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার)। ২০০৪ সালের পর সোনার বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ১৩ শতাংশ বিবেচনা করে হোগান ধারণা করছেন যে, ২০৩৬ সালের মধ্যে এই সঞ্চয় বাজার ১২১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিটকয়েন যদি এই বাজারের মাত্র ১৭ শতাংশ দখল করতে পারে, তবেই প্রতিটি কয়েনের দাম ১০ লক্ষ ডলারে পৌঁছানো সম্ভব।
বিপরীত দিকে, প্রযুক্তিগত সূচকগুলো বাজারে অস্থিরতা এবং স্বল্পমেয়াদী দরপতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্রিপ্টোকুয়েন্ট (CryptoQuant)-এর বিশ্লেষক উমিনকিউ (WoominKyu) লক্ষ্য করেছেন যে, লোকসানে থাকা বিটকয়েন সরবরাহের হার ৪০-৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, এই স্তরটি বাজারের দুর্বলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মন্দার (bearish trend) শুরুর সাথে সম্পর্কিত। সাধারণত এই হার ৫০ শতাংশ অতিক্রম না করা পর্যন্ত বাজারের সর্বনিম্ন স্তর বা 'বটম' তৈরি হয় না। এছাড়া, রুগারিসার্চ (RugaResearch)-এর তথ্যমতে, ৩০ দিনের ফান্ডিং রেট পার্সেন্টাইল ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৩ সালের শুরুর পর সর্বনিম্ন। এটি বাজারে ভারসাম্যহীনতা এবং আকস্মিক অস্থিরতার সংকেত হতে পারে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিটমেক্স (BitMEX)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আর্থার হেইস একটি সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি মনে করেন, ফেডারেল রিজার্ভের (Fed) মুদ্রানীতি শিথিল করার ওপরই বিটকয়েনের নতুন করে ক্রয়ের সম্ভাবনা নির্ভর করছে। হেইস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বিক্রির প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে বিটকয়েনের দাম ৬০,০০০ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, বিটকয়েনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে ফেডারেল রিজার্ভের আর্থিক সম্প্রসারণ, কোনো সংঘাত নয়। তবে স্বল্পমেয়াদী এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও, হেইস দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাসী। তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, তারল্য বৃদ্ধি পেলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বিটকয়েনের দাম ৫,০০,০০০ থেকে ৭,৫০,০০০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে।
২০২৬ সালের ১১ মার্চের বাজার পরিস্থিতি এই বিপরীতমুখী শক্তিগুলোর এক জটিল সংমিশ্রণ। ইটিএফ-এ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এবং এক্সচেঞ্জগুলোতে বিটকয়েনের সরবরাহ কমে যাওয়া একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষক টেড পিলোস (Ted Pillows)-এর মতে, দীর্ঘমেয়াদী রিলেটিভ স্ট্রেন্থ ইনডেক্স (RSI) ৪০-এর নিচে নেমে যাওয়া বাজারের তলানি বা 'বটম' তৈরির ইঙ্গিত হতে পারে। বর্তমান ৭০,০০০ ডলারের মূল্যস্তরটি এমন এক ভারসাম্য বিন্দু হিসেবে কাজ করছে, যেখানে সঞ্চয় বাজারের গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা এবং আর্থিক কড়াকড়ি ও প্রযুক্তিগত চাপের কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক উদ্বেগগুলো একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।



