২০২৬ সালের মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইলোন মাস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের আধিপত্য আরও সুসংহত করেছেন। বর্তমানে তার মোট ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ৮৩৯ বিলিয়ন ডলারে। এই অভাবনীয় আর্থিক প্রবৃদ্ধির মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তার মালিকানাধীন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স (SpaceX) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান এক্সএআই (xAI)-এর সফল একীভূতকরণ। এই দুই জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত নতুন কাঠামোর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে, যেখানে মাস্ক একাই প্রায় ৪৩ শতাংশ মালিকানা বজায় রেখেছেন।
গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত এই বিশাল ব্যবসায়িক চুক্তির ফলে ফোর্বসের প্রাক্কলন অনুযায়ী মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ এক লাফেই ৮৪ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৫২ বিলিয়ন ডলারে, যা তাকে ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৮০০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করার অনন্য কৃতিত্ব এনে দিয়েছে। এই একীভূতকরণের আগে মাস্কের হাতে স্পেসএক্সের ৪২ শতাংশ মালিকানা ছিল, যার বাজারমূল্য গত ডিসেম্বরের টেন্ডার অফার অনুযায়ী ছিল ৮০০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া তার হাতে এক্সএআই-এর ৪৯ শতাংশ শেয়ার ছিল, যা সাম্প্রতিক প্রাইভেট ফান্ডিং রাউন্ডের পর ২৫০ বিলিয়ন ডলারে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন গুগলের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ, যার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ২৫৭ বিলিয়ন ডলার। যদিও তিনি বর্তমানে অ্যালফাবেটের দৈনন্দিন পরিচালনা পর্ষদ থেকে দূরে রয়েছেন, তবুও তার নতুন উদ্যোগ 'ডায়নাটমিকস' (Dynatomics) তাকে আবারও বিনিয়োগকারীদের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এই স্টার্টআপটি মূলত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন শিল্পকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই উচ্চাভিলাষী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিটিহক (Kittyhawk)-এর সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ক্রিস অ্যান্ডারসন।
২৩৭ বিলিয়ন ডলারের বিশাল সম্পদ নিয়ে তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন সের্গেই ব্রিন। অ্যালফাবেটের অত্যাধুনিক 'জেমিনি' (Gemini) এআই মডেলের উন্নয়নে সরাসরি সম্পৃক্ততা তার এই আর্থিক উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্রিন সম্প্রতি এক বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক দিনগুলোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুগল কিছুটা রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করেছিল। তবে এখন কোম্পানিটি পূর্ণ গতিতে এআই প্রতিযোগিতায় লড়ছে এবং তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূলধন অর্জন করা। এই লক্ষ্য পূরণে তারা তাদের নিজস্ব সপ্তম প্রজন্মের 'আয়রনউড' (Ironwood) টিপিইউ চিপের ওপর ব্যাপক নির্ভর করছে।
অন্যদিকে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যামাজনের শেয়ারের মূল্যে কিছুটা পতন ঘটায় জেফ বেজোস ২২৪ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে তালিকার চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছেন। বেজোস বর্তমানে 'প্রজেক্ট প্রমিথিউস' (Project Prometheus) নামক একটি এআই স্টার্টআপের সহ-সিইও হিসেবে কাজ করছেন, যা মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং এবং উৎপাদন খাতের আধুনিকায়নে নিবেদিত। এই প্রকল্পটি ইতিমধ্যে ৬.২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এখানে বর্তমানে প্রায় ১০০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই ওপেনএআই (OpenAI) এবং ডিপমাইন্ড (DeepMind)-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছেন।
২২২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে মার্ক জাকারবার্গ তার পঞ্চম স্থানটি অটুট রেখেছেন। তবে ওরাকলের ল্যারি এলিসন কিছুটা পিছিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে চলে গেছেন। ওরাকল বর্তমানে 'স্টারগেট' (Stargate) নামক একটি বিশাল এআই অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এই প্রকল্পের আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এলিসন জানিয়েছেন যে, তাদের পরিকল্পিত ২০টি ডেটা সেন্টারের মধ্যে প্রথম ১০টির নির্মাণ কাজ পুরোদমে চলছে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টেক্সাসের অ্যাবিলিন শহরকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপের ধনকুবেরদের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন বার্নার্ড আরনল্ট, যিনি সামগ্রিক তালিকায় সপ্তম স্থানে অবস্থান করছেন। তার পরিবারের পাঁচ সন্তান বর্তমানে এলভিএমএইচ (LVMH)-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত পদে আসীন রয়েছেন, যা কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করছে। এদিকে, ওয়ারেন বাফেট ১৪৬ থেকে ১৪৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে নবম স্থানে ফিরে এসেছেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গ্রেগ অ্যাবেল বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা এই বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।



