মিলানো কর্টিনা ২০২৬ শীতকালীন অলিম্পিক গেমস গত ২২ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে শেষ হয়েছে, তবে ইতালির ডলোমাইট আল্পস অঞ্চলের জনপ্রিয়তা কেবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই পর্বতমালাটি এই বিশাল ক্রীড়া আসরের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক ইভেন্ট এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কোটি কোটি মানুষের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।
ইতালির পাঁচটি প্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত ১৪২ হাজার হেক্টরের এই অনন্য ভূখণ্ডটি এখন আর কেবল 'ইতালীয় আল্পস'-এর অংশ হিসেবে পরিচিত নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র পর্যটন বিস্ময় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কর্টিনা ডি’আম্পেজো, ভাল গারডেনা, আল্টা বাদিয়া, ভাল ডি ফাসা এবং আল্পে ডি সিউসি মালভূমির নাম এখন বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে পরিচিত। কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশন পর্দায় এই স্থানগুলোতে বায়থলন, ফিগার স্কেটিং এবং আলপাইন স্কিইং প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চকর দৃশ্য উপভোগ করেছেন, যা এই অঞ্চলের পরিচিতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অলিম্পিক গেমস এই অঞ্চলের শীতকালীন সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে, তবে ডলোমাইট আল্পস আসলে সারা বছরই পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। ঋতুভেদে এই অঞ্চলের আকর্ষণ ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়, যা পর্যটকদের বারবার এখানে ফিরে আসতে বাধ্য করে।
শীতকালে এখানে বিশ্বের বৃহত্তম স্কি নেটওয়ার্ক 'ডলোমিটি সুপারস্কি' সক্রিয় থাকে। এটি ১২টি আধুনিক রিসোর্ট, ১২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্কি ট্র্যাক এবং ৪৫০টি লিফট নিয়ে গঠিত এক বিশাল অবকাঠামো, যা শীতকালীন ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য স্বর্গরাজ্য।
গ্রীষ্মকালে এই পাহাড়ি পথগুলো ট্রেকিং এবং সাইক্লিংয়ের জন্য আদর্শ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ 'সেলারোন্ডা' রুটটি পর্যটকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই পথে ভ্রমণকারীরা গারডেনা, ক্যাম্পো লঙ্গো, পর্ডোই এবং সেলা—এই চারটি প্রধান গিরিপথ অতিক্রম করার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের অফ-সিজনে এই অঞ্চলটি শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশের সন্ধানকারী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এ সময় আবহাওয়া ভ্রমণের জন্য বেশ অনুকূল থাকে এবং পর্যটকদের ভিড়ও তুলনামূলক কম থাকে। বিশেষ উল্লেখ্য হলো ইউরোপের বৃহত্তম উচ্চভূমি মালভূমি আল্পে ডি সিউসি (Seiser Alm), যা ১৬৮০ থেকে ২৩৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। শীতকালে এটি স্কি অবকাঠামোর অংশ হলেও গ্রীষ্মে এটি সাসোলুঙ্গো পর্বতের মনোরম দৃশ্যসহ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক প্রান্তরে পরিণত হয়।
৬ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মিলান, কর্টিনা ডি’আম্পেজো, লিভিগনো এবং ভাল ডি ফিয়েমে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক প্রতিযোগিতাগুলো এই অঞ্চলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অলিম্পিকের রেশ এখনো পাহাড়ের বাতাসে মিশে আছে এবং তৈরি করা উন্নত অবকাঠামো ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন সুযোগের দ্বার উন্মোচন করেছে। ২০৩০ সালে ফরাসি আল্পসে পরবর্তী শীতকালীন অলিম্পিকের প্রস্তুতি চললেও, অলিম্পিক ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে ডলোমাইট আল্পস এখনো পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে রয়েছে।
তবে এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা যেমন সুযোগ এনেছে, তেমনি কিছু ঝুঁকিও তৈরি করেছে। পরিবেশবিদরা 'ওভারট্যুরিজম' বা অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ফলে এই ভঙ্গুর পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের ওপর মানুষের চাপ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য এই অঞ্চলকে কিছু কঠোর বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়, যা নিশ্চিত করে যে পর্যটন যেন প্রকৃতির ক্ষতি না করে:
- প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ বা ভূচিত্র রক্ষার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
- নতুন কোনো নির্মাণ কাজের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ।
- পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বিশেষ নজরদারি।
অলিম্পিক আয়োজকরা এই পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন। তারা নতুন স্থাপনা তৈরির পরিবর্তে ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রে আগে থেকে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেছেন, যা টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ।
অলিম্পিক পরবর্তী সময়ে ডলোমাইট আল্পস সম্পর্কে বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তিগুলো নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। প্রখ্যাত পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনার একবার বলেছিলেন, "ডলোমাইট হলো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর পর্বতমালা।" অন্যদিকে বিখ্যাত স্থপতি লে কর্বুসিয়ার এই পর্বতমালাকে "প্রাকৃতিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
আজ এই কথাগুলো কেবল কাব্যিক বর্ণনা নয়, বরং এই অঞ্চলের বাস্তব সম্মানের প্রতিফলন। অলিম্পিকের পর ডলোমাইট কেবল একটি ক্রীড়া কেন্দ্র নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এর অনন্য সৌন্দর্য এবং অলিম্পিক হেরিটেজ সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে একে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।



