জেফ বেজোস প্রতিষ্ঠিত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ব্লু অরিজিন (Blue Origin) তাদের পুনঃব্যবহারযোগ্য সাবঅরবিটাল সিস্টেম নিউ শেপার্ডের (New Shepard) উড্ডয়ন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করার একটি বড় ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে কার্যকর হওয়া এই কৌশলগত বিরতি অন্তত দুই বছর স্থায়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মূলত কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সাবঅরবিটাল ফ্লাইটের জন্য পূর্বে বরাদ্দকৃত বিশাল সম্পদ এবং জনবল এখন ব্লু মুন (Blue Moon) নামক মানববাহী লুনার ল্যান্ডার তৈরির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তটি সরাসরি নাসার (NASA) উচ্চাভিলাষী 'আর্টেমিস' প্রোগ্রামের মাধ্যমে চাঁদে পুনরায় নভোচারী পাঠানোর জাতীয় লক্ষ্যের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ব্লু অরিজিন বর্তমানে নাসার অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে এবং চাঁদের পৃষ্ঠে ক্রু পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্লু মুন ল্যান্ডার তৈরির উদ্দেশ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের মধ্যেই ব্লু অরিজিন তাদের এই লুনার মডিউল ব্যবহার করে একটি রোবোটিক প্রদর্শনী মিশন পরিচালনা করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। 'পাথফাইন্ডার মিশন' (Pathfinder Mission) নামে পরিচিত এই অভিযানটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর দুর্গম এলাকায় অবতরণ করবে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো মানববাহী মিশনের আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো যাচাই করা।
বিখ্যাত মহাকাশচারী অ্যালান শেপার্ডের নামানুসারে তৈরি নিউ শেপার্ড সিস্টেমটি ২০২১ সালে তার প্রথম মানববাহী সফল ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই সিস্টেমটি মোট ৩৮টি উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ৯৮ জন পর্যটককে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে কারমান রেখার (Karman Line) ওপারে নিয়ে যাওয়ার গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। স্থগিতাদেশের ঘোষণার ঠিক আগে, ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি সর্বশেষ মানববাহী ফ্লাইট এনএস-৩৮ (NS-38) পরিচালিত হয়েছিল। নিউ শেপার্ডের এই সাময়িক বিরতি ব্লু অরিজিনকে তাদের নিউ গ্লেন (New Glenn) নামক শক্তিশালী অরবিটাল রকেট তৈরির দিকেও আরও নিবিড়ভাবে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেবে, যা নিউ শেপার্ডের মতোই ভার্টিকাল ল্যান্ডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
বর্তমানে আর্টেমিস ৩ মিশনের আওতায় চাঁদে মানুষ নামানোর অধিকার নিশ্চিত করতে ব্লু অরিজিন এবং স্পেসএক্স-এর (SpaceX) মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। নাসা ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর সময়সীমা ত্বরান্বিত করার জন্য উভয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্রুততর পরিকল্পনা জমা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। ব্লু অরিজিন তাদের ব্লু মুন মার্ক ১ (Blue Moon Mark 1) মডিউলটি নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী, যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে স্পেসএক্সের স্টারশিপের (Starship) আগেই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে। প্রায় ৮.১ মিটার উচ্চতার এই মার্ক ১ মডিউলটি চাঁদের পৃষ্ঠে তিন মেট্রিক টন পর্যন্ত মালামাল বহন করতে সক্ষম এবং এটি নাসার কমার্শিয়াল লুনার পে-লোড সার্ভিসেস (CLPS) উদ্যোগের অধীনে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছে।
এই অত্যাধুনিক ল্যান্ডারটি মূলত মার্ক ২ সংস্করণের পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করবে, যা ২০২৯ সালের আর্টেমিস ৫ মিশন অথবা ২০৩০ সালের পরবর্তী মানববাহী ফ্লাইটগুলোর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মার্ক ১-এর প্রথম নমুনাটি টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত নাসার বিশেষ তাপীয় ভ্যাকুয়াম চেম্বারে কঠোর পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সাবঅরবিটাল পর্যটন থেকে সরে আসা ব্লু অরিজিনের জন্য একটি সাহসী সিদ্ধান্ত, কারণ ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই খাত থেকে তাদের আয় ১০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে জেফ বেজোস এবং তার প্রতিষ্ঠানের জন্য বর্তমান বৈশ্বিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চন্দ্র অভিযান এবং সেখানে স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যে এখন প্রধান অগ্রাধিকার, এই পদক্ষেপটি তারই একটি জোরালো প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।



