২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ও ব্রাজিলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত: প্রেসিডেন্ট লুলার রাষ্ট্রীয় সফর পরবর্তী নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নয়াদিল্লি সফর এবং ভারত-ব্রাজিল বিজনেস ফোরামের আয়োজন দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। প্রেসিডেন্ট লুলা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মূল নির্যাস ছিল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা এখন কমপক্ষে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে নির্ধারিত ২০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সিদ্ধান্তটি মূলত দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর করার দৃঢ় ইচ্ছাকেই প্রতিফলিত করে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সংরক্ষণবাদী নীতিমালার প্রেক্ষাপটে, যা লুলার মতে উভয় দেশকেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
সহযোগিতার এই নতুন অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং বিরল মৃত্তিকা উপাদানের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষর। ব্রাজিল বর্তমানে এই কৌশলগত সম্পদগুলোর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাণ্ডার হিসেবে স্বীকৃত, যা আধুনিক ইলেকট্রনিক্স, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত এখন খনিজ সরবরাহের ক্ষেত্রে চীনের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতা কমিয়ে ব্রাজিলের মতো একটি শক্তিশালী বিকল্প উৎসের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এই চুক্তিকে একটি স্থিতিশীল এবং টেকসই সরবরাহ চেইন গড়ে তোলার পথে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ভারত ও ব্রাজিলের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইতিমধ্যেই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। তবে গোয়েল এই বর্তমান স্তরকে "অপ্রতুল" হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং লুলার এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি "নির্ধারক মুহূর্ত" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ভারত ও ব্রাজিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একে অপরের স্বাভাবিক অংশীদার। প্রধানমন্ত্রী মোদীও লাতিন আমেরিকায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে ব্রাজিলের অবস্থানকে পুনঃনিশ্চিত করেছেন।
কাঁচামাল সরবরাহের বাইরেও দুই দেশের এই অংশীদারিত্ব প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব এবং স্থায়িত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে। সফরের অংশ হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আরও নয়টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাজিলে 'সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ফর ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার' স্থাপন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সুপারকম্পিউটিং সিস্টেম ও ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে প্রেসিডেন্ট লুলা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বহুপাক্ষিক এআই শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য উৎস, ইথানল মিশ্রণ এবং টেকসই বিমান জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মূলত একটি জৈব জ্বালানি জোট গঠনের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা। প্রেসিডেন্ট লুলার সাথে আসা প্রতিনিধি দলটি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী, যার মধ্যে ১১ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং অসংখ্য শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এটি প্রতিরক্ষা, ওষুধ শিল্প, কৃষি এবং জৈব জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে অংশীদারিত্ব গভীর করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এছাড়াও, ভারত ও মেরকোসুরের (MERCOSUR) মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বর্তমানে ৪৫০টি ট্যারিফ লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিনিধিত্বসহ বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়। এটি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এই জোটের কৌশলগত গুরুত্বকে তুলে ধরে। লুলা ভারতকে একটি "ডিজিটাল পরাশক্তি" এবং ব্রাজিলকে "নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরাশক্তি" হিসেবে অভিহিত করে বিশ্ব বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গঠনে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি, ব্রাজিল তাদের ডালজাতীয় শস্যের জন্য ভারতীয় বাজার উন্মুক্ত করা এবং পোল্ট্রি মাংসের ওপর বিদ্যমান ১০০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ আমদানি শুল্ক পুনর্বিবেচনার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
8 দৃশ্য
উৎসসমূহ
The Times of India
India, Brazil set Bilateral trade target of over USD 20 Billion in five years
Modi-Lula talks: India, Brazil target $20 billion trade in 5 years, sign critical minerals pact - The Tribune
Lula's India Visit 2026: Why Brazil's Largest-Ever Delegation Matters - Open Magazine
India and Brazil set $30 billion trade target by 2030; sign mineral, rare earth pact - Zee News
Visit of Brazilian President marks a defining moment in India-Brazil relationship: Union Minister Piyush Goyal - Newsonair
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
