ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স (পূর্বে টুইটার) ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্টটি স্থগিত করে দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি এসেছে ব্রাসেলসের পক্ষ থেকে ডিজিটাল পরিষেবা আইন (ডিএসএ) লঙ্ঘনের অভিযোগে রেকর্ড পরিমাণ ১২০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা আরোপের প্রতিক্রিয়ায়। এটি স্পষ্টতই একটি পাল্টা জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৫ সালের ৭ বা ৮ ডিসেম্বরের কাছাকাছি সময়ে। এর ঠিক আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৪ বা ৫ ডিসেম্বরে, ইউরোপীয় কমিশন ডিএসএ-এর অধীনে প্রথম কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে এই বিশাল অঙ্কের জরিমানার ঘোষণা দেয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এক্স-এর বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছিল। প্রথমত, তারা 'নীল টিক' ব্যবস্থার নকশাকে প্রতারণামূলক বলে চিহ্নিত করে, যা এখন ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এক্স-এর বিজ্ঞাপন ভান্ডার (Ad Repository) সংক্রান্ত স্বচ্ছতার অভাব ছিল। এবং তৃতীয়ত, প্ল্যাটফর্মটি অনুমোদিত গবেষকদের জন্য সর্বজনীন ডেটাতে পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকার করেছিল। কমিশন এক্স-কে এই ত্রুটিগুলো সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়: 'নীল টিক' সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য ৬০ কার্যদিবস এবং বিজ্ঞাপন স্বচ্ছতা ও ডেটা অ্যাক্সেসের বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ৯০ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল।
জরিমানার জবাবে, এক্স-এর প্রোডাক্ট বিভাগের প্রধান নিকিতা বির তার প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, তারা ইসি-এর বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্টটি নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন। এই ঘোষণাটি তিনি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর, রবিবার দেন। বির পাল্টা অভিযোগ তোলেন যে, কমিশন একটি 'নিষ্ক্রিয় বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট' ব্যবহার করে 'অ্যাড কম্পোজার' টুলের একটি দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা জরিমানার বিষয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার সময় লিঙ্কে ভিডিওর আড়াল নিয়ে কৃত্রিমভাবে প্রচারের মাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশন এই অভিযোগগুলো দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে যে তারা বিজ্ঞাপন সরঞ্জামগুলো সৎভাবে ব্যবহার করে আসছে। তবে, এই ঘটনার পরেও ইউরোপীয় কমিশনের মূল এক্স অ্যাকাউন্টটি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে।
এই বিতর্কটি দ্রুত ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে। এক্স-এর মালিক ইলন মাস্ক প্রকাশ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে 'স্বৈরাচার' আখ্যা দিয়ে এটিকে 'ভেঙে ফেলার' আহ্বান জানান। মজার বিষয় হলো, এই মন্তব্যে কিছু আমেরিকান কর্মকর্তার সমর্থন দেখা যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই জরিমানাকে 'আমেরিকান জনগণের ওপর আক্রমণ' বলে অভিহিত করেন, এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ব্রাসেলসের সমালোচনা করে বলেন যে তারা 'তুচ্ছ কারণে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে'। তবে, এই বক্তব্যের বিপরীতে পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি মাস্কের মন্তব্যকে 'বেপরোয়া এবং বিপজ্জনক' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার প্রশ্ন দিয়ে শুরু হওয়া এই বিরোধ এখন সরাসরি বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এই ঘটনাটি ঘটে ইলন মাস্কের হাতে প্ল্যাটফর্ম অধিগ্রহণের দুই বছরেরও বেশি সময় পরে (অক্টোবর ২০২২), এবং তদন্ত শুরু হওয়ার এক বছর পরে (ডিসেম্বর ২০২৩)। এটি ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ব্রাসেলসের কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে। উল্লেখ্য, কমিশনের কার্যনির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনা ভিরকুনেন এর আগে স্পষ্ট করেছিলেন যে ডিএসএ সেন্সরশিপের সাথে সম্পর্কিত নয়, যা আমেরিকান রাজনীতিবিদদের দাবিকে খণ্ডন করে।



