ওয়াশিংটন ডিসিতে ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের উদ্যোগে নবগঠিত 'বোর্ড অফ পিস' (BoP) বা শান্তি পরিষদের এটিই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক অধিবেশন। এই সমাবেশের প্রধান লক্ষ্য হলো গাজা উপত্যকার বিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ এবং বৈশ্বিক সম্পদ একত্রিত করা। এই উদ্যোগটি মূলত ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক ঘোষিত গাজা সংঘাত নিরসনের 'সমন্বিত পরিকল্পনা'-এর দ্বিতীয় ধাপের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করবে।
এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের ভেন্যু হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অফ পিস। এই ভবনটি ইতিপূর্বে ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অফ পিস (USIP) এর সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রখ্যাত স্থপতি মোশে সাফদির অসাধারণ নকশায় তৈরি এই ভবনটির নির্মাণ কাজ ২০১১ সালে সম্পন্ন হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সম্মেলনের ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদি নেতানিয়াহু ১৯ তারিখের এই শান্তি পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন, তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ হামলার পর এটিই হবে কোনো প্রকাশ্য মঞ্চে আরব ও মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সাথে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।
'বোর্ড অফ পিস' বা শান্তি পরিষদ গঠনের আইনি ভিত্তি হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব, যা ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর গৃহীত হয়েছিল। এই প্রস্তাবের মাধ্যমেই গাজা সংঘাত অবসানে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত 'সমন্বিত পরিকল্পনা' আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) তাদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে শেষ না করা পর্যন্ত গাজার পুনর্গঠন কাজের যাবতীয় অর্থায়ন এবং তদারকির দায়িত্ব এই পরিষদের হাতে থাকবে। তবে নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাবটি পাসের সময় পূর্ণ ঐক্যমত্য দেখা যায়নি; ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৩টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও চীন ও রাশিয়া ভোটদান থেকে বিরত ছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই পরিষদের উচ্চপর্যায়ের নির্বাহী বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সাথে এই বোর্ডে আরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। অন্যদিকে, গাজার মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কার্যাবলী পরিচালনার জন্য 'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ গাজা' (NCAG) গঠন করা হয়েছে, যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডক্টর আলী শাআত। ১৯ ফেব্রুয়ারির এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা হলো পুনর্গঠন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল অংকের প্রাথমিক তহবিল নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করার জন্য অন্তত কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক মূলধনের প্রয়োজন হবে।
তবে এই পরিষদের গঠনতন্ত্র এবং কার্যপদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, পরিষদের মূল সনদে ফিলিস্তিনিদের সরাসরি কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকাটা একটি বড় ঘাটতি। এছাড়া পরিষদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্মতির বাধ্যবাধকতা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে নির্দেশ করে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জাতিসংঘের কাঠামোর বাইরে গিয়ে এমন একটি বৈশ্বিক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে জাতিসংঘের চিরাচরিত প্রভাব ও ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতার এই একমুখীকরণ এবং ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের অভাব বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে।



