২০ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নজিরবিহীন কূটনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত করেন। তিনি তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে করা ব্যক্তিগত টেক্সট বার্তার বেশ কিছু স্ক্রিনশট জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি কেনার বিষয়ে ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থান এবং ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশের ওপর বিশাল অংকের শুল্ক আরোপের মার্কিন হুমকির কারণে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের দেশগুলোর মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র ইতিমধ্যে এই ফাঁস হওয়া বার্তার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ম্যাক্রোঁর পাঠানো বার্তায় সিরিয়া এবং ইরানের বিষয়ে দেশ দুটির মধ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতার কথা উল্লেখ ছিল। তবে একই সাথে তিনি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আকস্মিক ও বিতর্কিত পদক্ষেপে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। ম্যাক্রোঁ সরাসরি ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন, "গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আপনি আসলে কী করছেন, তা আমি মোটেও বুঝতে পারছি না।" উল্লেখ্য যে, এর আগে গাজায় ট্রাম্পের প্রস্তাবিত 'শান্তি পরিষদে' যোগ দিতে অস্বীকার করায় ফরাসি ওয়াইন এবং শ্যাম্পুর ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বিদ্যমান এই উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ আগামী ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে প্যারিসে একটি বিশেষ জি-৭ (G7) বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। দাভোস ফোরাম শেষ হওয়ার পরপরই এই বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে মূল সদস্যদের পাশাপাশি ইউক্রেন, ডেনমার্ক, সিরিয়া এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানোর একটি সম্ভাবনা রাখা হয়েছে। এই বাণিজ্য যুদ্ধের সূত্রপাত হয় যখন ট্রাম্প গত শনিবার ঘোষণা করেন যে, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ থেকে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস—এই আটটি ইউরোপীয় দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, ১ জুনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির বিষয়ে 'সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত' কোনো সমঝোতা না হলে এই শুল্কের হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় কমিশন সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং ইইউ-এর 'অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট' (ACI) সক্রিয় করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
এই সংকটের গভীর প্রেক্ষাপট মূলত রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে আর্কটিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও সামরিক স্বার্থের সাথে জড়িত। এই স্বার্থের কারণেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের দাবিতে অনড় রয়েছেন। ১৯ থেকে ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পরিবেশও এই অমীমাংসিত বিতর্কের কারণে অত্যন্ত থমথমে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাবে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন এবং নেদারল্যান্ডস গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেখানে যৌথভাবে সৈন্য পাঠিয়েছে। ট্রাম্প এই সামরিক পদক্ষেপকে একটি "অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলা" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ বারবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই দ্বীপটি কোনোভাবেই বিক্রির জন্য নয়। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন অবশ্য সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংলাপের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২২ জানুয়ারি প্যারিসে রাশিয়া ও ডেনমার্কের অংশগ্রহণে ম্যাক্রোঁর এই অনানুষ্ঠানিক জি-৭ বৈঠকের প্রস্তাবটি মূলত একটি বিস্তৃত কূটনৈতিক চ্যানেল খোলার প্রচেষ্টা। এটি ২০২৬ সালের জুনে ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেইনসে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক জি-৭ সম্মেলন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি উদ্যোগ, যেখানে রাশিয়ার উপস্থিতির কোনো পরিকল্পনা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের এই নীতির সমালোচনা হচ্ছে; রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন ডেনমার্কের ওপর ট্রাম্পের এই চাপ প্রয়োগকে "অবমাননাকর" বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস (Fitch Ratings) সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই শুল্কের হুমকি ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংস্থাটি মনে করে, এটি রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধের ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে মার্কিন সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।




