২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগের দিন থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ আন্তঃসীমান্ত সংঘর্ষের পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আফগানিস্তানের তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে 'খোলাখুলি যুদ্ধ' ঘোষণা করেছেন। ইসলামাবাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে উল্লেখ করে তিনি এই কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান।
এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হলো ডুরান্ড লাইন, যা প্রায় ২৬৪০ থেকে ২৬৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিতর্কিত সীমান্ত এবং কাবুল ঐতিহাসিকভাবে এটি স্বীকার করে না। ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান সশস্ত্র বাহিনী পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের আক্রমণ চালালে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আফগানদের দাবি, এটি ছিল তাদের ভূখণ্ডে পাকিস্তানের আগের বিমান হামলার জবাব। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান 'গজব লিল হক' (ন্যায়বিচারের ক্রোধ বা প্রাজ্ঞ রোষ) নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানি বিমান বাহিনী রাজধানী কাবুল, কান্দাহার এবং পাক্তিয়া প্রদেশসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।
এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে পাকিস্তানে সাম্প্রতিক একাধিক সন্ত্রাসী হামলা। বিশেষ করে ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদে একটি শিয়া মসজিদে বোমা হামলার ঘটনায় পাকিস্তান সরাসরি আফগান তালেবানদের দায়ী করেছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, তালেবানরা 'তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান' (টিটিপি)-এর জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। এর আগে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে খাজা আসিফ রমজানের আগেই সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের শেষদিকে যে কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল, এই সংঘাতের ফলে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
উভয় পক্ষই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ আলী জাইদি দাবি করেছেন যে, তাদের অভিযানে ১৩৩ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০-এর বেশি আহত হয়েছে। এছাড়াও তারা ২৭টি পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি পোস্ট দখলের দাবি করেন। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তাদের হামলায় ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং তারা কয়েক ডজন সামরিক যান জব্দ করেছে। আফগানদের পক্ষে ৮ জন সেনা নিহত এবং ১১ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তালেবানরা আরও দাবি করেছে যে তারা পাকিস্তানের দুটি স্থাপনা ধ্বংস এবং ১৯টি সেনা পোস্ট দখল করেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ তালেবানদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন যে তারা আফগানিস্তানকে 'ভারতের উপনিবেশে' পরিণত করেছে এবং সেখান থেকে 'সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি' করছে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যে, তালেবানরা বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসীদের আফগানিস্তানে জড়ো করেছে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম প্রদত্ত নারীদের অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। পাকিস্তান বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও এখন তাদের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিপরীত দিকে, আফগান প্রতিরক্ষা বিভাগ জোর দিয়ে বলেছে যে তাদের পদক্ষেপ ছিল পাকিস্তানের প্রাণঘাতী বিমান হামলার পাল্টা জবাব, যাতে বেসামরিক নাগরিকরা প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার অনুরোধ জানিয়েছেন। বর্তমানে তোরখামসহ প্রধান সীমান্ত পারাপারগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা এই অঞ্চলের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।



