আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগনের জারি করা কঠোর বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করেছে বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে। এই মামলাটি সরাসরি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হ্যাগসেটকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। মামলাটির মূল উদ্দেশ্য হলো সেই নতুন নিয়মাবলীকে চ্যালেঞ্জ করা যা ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে কার্যকর হয়েছিল এবং যা অনুমোদিত সাংবাদিকদের চলাফেরার ওপর মারাত্মকভাবে লাগাম টেনে ধরেছিল। এই আইনি লড়াই শুরু হয়েছে ওয়াশিংটন ডি.সি.-এর মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে।
এই আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা বিভাগের তৈরি করা এক বিশাল ২১ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র। ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে অবস্থিত পেন্টাগনের সদর দপ্তরে কাজ করতে আসা সকল সাংবাদিককে এই নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই চুক্তির শর্তানুযায়ী, সাংবাদিকদের কোনো তথ্য, এমনকি যা গোপনীয় নয়, তা সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া চাওয়া বা সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস দৃঢ়ভাবে দাবি করছে যে এই ধরনের বিধিনিষেধ আসলে অসাংবিধানিক ‘পূর্বানুমোদন’ বা ‘prior restraint’-এর শামিল। তাদের মতে, এটি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বর্ণিত বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অধিকার এবং পঞ্চম সংশোধনীতে উল্লিখিত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াকে লঙ্ঘন করে। সংবাদপত্রটির বিশ্বাস, বর্তমান প্রশাসনের অপছন্দের বিষয়গুলো আড়াল করাই এই নীতির মূল লক্ষ্য, যার ফলে সাধারণ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই মামলায় দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে সহ-আবেদনকারী হিসেবে রয়েছেন এনওয়াইটি-এর সাংবাদিক জুলিয়ান ই. বার্নস, যিনি নতুন শর্তাবলীতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মুখপাত্র চার্লি স্টাটল্যান্ডার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে এটি হলো “সরকারের অপছন্দের প্রতিবেদনগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি প্রচেষ্টা”। আইনজীবীদের মতে, এই বিধিনিষেধগুলো মৌলিক সাংবাদিকতার নিশ্চয়তাগুলোকে বিপন্ন করছে। এই কারণে, প্রতিবাদস্বরূপ বেশ কিছু প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আগেই পেন্টাগনের অফিস ত্যাগ করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং রয়টার্স। যদিও তারা প্রেস কার্ড জমা দিয়েছেন, তবুও তারা বাইরে থেকে সামরিক বাহিনীর কার্যকলাপের ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৫ জন সাংবাদিক নতুন শর্তাবলীতে সম্মতি জানিয়েছেন। এদের মধ্যে ওয়ান আমেরিকা নিউজ, দ্য ফেডারেলিস্ট এবং দ্য ইপক টাইমস-এর প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। এই শর্ত মেনে নিলে তারা কেবল পূর্ব-অনুমোদিত বিষয়গুলোই রিপোর্ট করতে পারবেন। সচিব হ্যাগসেট পূর্বে মন্তব্য করেছিলেন যে পেন্টাগনে প্রবেশ করা ‘অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুবিধা’। তিনি দাবি করেন যে এই বিধিনিষেধগুলো কর্মীদের গোপনীয় তথ্য ফাঁস হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয়, যা অপারেশনাল নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের আইনি অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে ঐতিহাসিক নজিরের ভিত্তিতে। ১৯৭০ সালের ‘পেন্টাগন পেপারস’ মামলায় (‘নিউ ইয়র্ক টাইমস কো. বনাম ইউনাইটেড স্টেটস’ মামলা, ১৯৭১) মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে ‘prior restraint’ হলো প্রথম সংশোধনীর অধিকারের ওপর সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘন। পেন্টাগন প্রেস অ্যাসোসিয়েশনও এই আইনি পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে, এটিকে ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের বিপরীত’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাতের আবহে, যে সকল সংবাদমাধ্যম পেন্টাগন ভবন ছেড়ে বাইরে থেকে প্রতিবেদন তৈরি করছে, তারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সংবেদনশীল সামরিক অভিযানগুলোর ওপর আলোকপাত করছে। সম্প্রতি এই সংবাদ সংস্থাগুলো এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা ক্যারেবিয়ান অঞ্চলে চালানো সামরিক অভিযানগুলোতে সচিব হ্যাগসেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষত, একটি নৌকায় ‘দ্বৈত আঘাত’ হানার ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরাও নিহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটিকে বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে দেখছেন এবং এটি মার্কিন কংগ্রেসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সুতরাং, এই সংঘাতটি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার সরকারি দাবি এবং সংবাদপত্রের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তার মধ্যে এক সরাসরি সংঘাতের চিত্র তুলে ধরেছে।



