২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি, শনিবার উগান্ডার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনিকে সপ্তম মেয়াদের জন্য বিজয়ী ঘোষণা করেছে। ১৯৮৬ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকা মুসেভেনি এবারের নির্বাচনে ৭১.৬৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, যা সংখ্যায় প্রায় ৭৯,৪৪,৭৭২টি ব্যালট। তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিরোধী দল 'ন্যাশনাল ইউনিটি প্ল্যাটফর্ম' (NUP)-এর প্রভাবশালী নেতা রবার্ট কিয়াগুলানি, যিনি বিশ্বজুড়ে ববি ওয়াইন নামে সমধিক পরিচিত, ২৪.৭২ শতাংশ বা ২৭,৪১,২৩৮টি ভোট পেয়েছেন। তবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই ববি ওয়াইন একে "সাজানো ও বানোয়াট" বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি বলে দাবি করেছেন।
পুরো নির্বাচনী প্রচারকাল এবং ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবারের ভোটের দিনটি ছিল চরম উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠায় ঘেরা। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ১৩ জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শনিবার সন্ধ্যায় পুনরায় চালু করা হয়। উগান্ডা কমিউনিকেশনস কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান সাইমন বায়াবাকামা দাবি করেছেন যে অপপ্রচার রোধ এবং সম্ভাব্য সহিংসতা দমনে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন ছিল। তবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এই পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কারণ যোগাযোগের এই অভাব নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ঘটনার সঠিক নথিবদ্ধকরণে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে, তথাকথিত বিরোধী "দাঙ্গাকারীদের" হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য চালানো গুলিতে অন্তত সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন। এর বিপরীতে, সংসদ সদস্য মুওয়াঙ্গা কিভুম্বি এক গুরুতর অভিযোগে দাবি করেছেন যে, নিরাপত্তা বাহিনী তার নিজের বাসভবনেই দশজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। বিরোধী নেতা ববি ওয়াইন আরও অভিযোগ করেছেন যে, তার বাড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর অতর্কিত অভিযানের পর তাকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং তিনি অল্পের জন্য অপহরণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরম অস্থিরতাকে ফুটিয়ে তোলে।
ভোটগ্রহণের ঠিক আগমুহূর্তে বায়োমেট্রিক ভোটার শনাক্তকরণ যন্ত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় রাজধানী কাম্পালাসহ বিরোধী দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত শহরাঞ্চলগুলোতে ভোট গ্রহণে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে। এই যান্ত্রিক বিভ্রাটের কারণে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত ম্যানুয়াল বা হাতে লেখা ভোটার তালিকা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। নাইজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গুডলাক জোনাথনের নেতৃত্বে পরিচালিত আফ্রিকান ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ মিশন জানিয়েছে যে, তারা যেসব ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন সেখানে সরাসরি ব্যালট বাক্স ভর্তির মতো কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাননি। তবে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে অনেক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
১৯৮৬ সালে মিল্টন ওবোটের শাসনের পতনের পর ক্ষমতায় আসা ইয়োওয়েরি মুসেভেনি উগান্ডায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেও, তার দীর্ঘস্থায়ী শাসনকাল নিয়ে সমালোচনা কম নয়। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ার বিষয়টি তাকে আজীবন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছে বলে বিরোধীরা মনে করেন। এমন রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই উগান্ডার অর্থনীতি ২০২৬ সালে ৬.৫ থেকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মূলে রয়েছে ওই বছর থেকে শুরু হতে যাওয়া বাণিজ্যিক তেল উৎপাদন। ব্যাংক অফ উগান্ডার গভর্নর মাইকেল আতিঙ্গি-এগো জোর দিয়ে বলেছেন যে, তেলের এই বিশাল রাজস্ব অবশ্যই দেশের অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে হবে যাতে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।




