২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই আলোচনার জন্য তিনি কিছু কঠোর শর্তারোপ করেছেন। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার প্রেক্ষাপটেই এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি তেহরানের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন যে, যেকোনো আলোচনা হতে হবে "ন্যায়সঙ্গত এবং সমানাধিকারের ভিত্তিতে"। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই সংলাপ অবশ্যই হুমকি এবং অযৌক্তিক প্রত্যাশা থেকে মুক্ত পরিবেশে পরিচালিত হতে হবে এবং এতে "মর্যাদা, বিচক্ষণতা এবং উপযোগিতা" বজায় রাখতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার ইস্তাম্বুলে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। জানা গেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই এই আলোচনার বিষয়ে মৌন সম্মতি দিয়েছেন। মূলত দেশের অর্থনৈতিক সংকট এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে শাসনের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের ফলেই তিনি এই নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভের ফলে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চরমে পৌঁছায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান পারমাণবিক উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। তেহরান জোর দিয়ে বলছে যে, আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হবে শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞার বিনিময়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নির্ধারণ করা। তবে ইরানি কর্মকর্তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থনের বিষয়ে কোনো প্রকার আলোচনার সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে আছে, যার প্রতীক হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে আমেরিকা "মিডনাইট হ্যামার" নামক একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ফোরদো এবং নাতাঞ্জসহ তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্যানুসারে, এই হামলার ফলে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অনেকখানি পিছিয়ে গেছে। এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, যদি একটি "ন্যায্য চুক্তি" না হয়, তবে পরবর্তী আক্রমণ হবে "আরও ভয়াবহ"।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাব্য আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইস্তাম্বুলের বৈঠকটি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের নমনীয়তা এবং শর্তাবলি মেনে নেওয়ার ওপর। তবে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে ফেরার এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।




