২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক সংকট নিরসনে তেহরানের নীতিগত প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনার পর এই ঘোষণা আসে, যেখানে আরাগচির মতে "নির্দেশনামূলক নীতি" নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তিনি একটি পারস্পরিক লাভজনক সমাধানে পৌঁছানোর ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং সতর্ক করে দেন যে, সামরিক পথ পুরো অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি বয়ে আনবে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ইরান মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের কাছে একটি লিখিত চুক্তির খসড়া প্রস্তাব পেশ করবে বলে তিনি জানান।
কূটনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে ওয়াশিংটন তার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ধারা অব্যাহত রেখেছে। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য দায়িত্ব গ্রহণকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি "অর্থবহ চুক্তিতে" পৌঁছানোর জন্য ১০ থেকে ১৫ দিনের কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। এই সময়ের মধ্যে কোনো সমাধান না এলে গুরুতর পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এই উত্তজনাকে আরও উসকে দিয়েছে, যার মধ্যে বিমানবাহী রণতরী 'আব্রাহাম লিঙ্কন'-এর মোতায়েন এবং 'ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড'-এর সম্ভাব্য আগমন অন্তর্ভুক্ত। বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই অঞ্চলে এটিই সবচেয়ে বড় বিমান শক্তি সমাবেশ।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আরাগচি দাবি করেছেন যে, আলোচনার সময় মার্কিন পক্ষ সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য চাপ না দিয়ে বরং "আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপের" ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক, যিনি এর আগে সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। তদুপরি, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির ওপর মার্কিন সীমাবদ্ধতা আরোপের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন, যা একটি স্থায়ী চুক্তির পথে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার এই আলোচনা গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাস্কাটে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার তুলনায় অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ছিল। মার্কিন প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার, আর ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন আরাগচি। আইএইএ (IAEA) প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও এই আলোচনায় অংশ নেন এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কারিগরি তদারকির বিষয়ে আলোকপাত করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সীমাবদ্ধতার কারিগরি কাঠামো নিয়ে আলোচনার অর্থ হলো প্রক্রিয়াটি এখন "খসড়া তৈরির" পর্যায়ে পৌঁছেছে, যদিও এটি তাৎক্ষণিক কোনো সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।
অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে, যা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে স্পষ্ট। তাদের মতে, আলোচনা ব্যর্থ হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে "কাইনেটিক অ্যাকশন" বা সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। এই উত্তেজনা গত বছরের ঘটনাবলির মাধ্যমে আরও ঘনীভূত হয়েছে; ২০২৫ সালের জুনে ইরানীয় পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলা এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সরকারি তথ্যমতে, এই বিক্ষোভে ৩,১১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে আপস করতে রাজি হলেও তাদের প্রতিরক্ষা মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ফলে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর এই আলোচনা শান্তি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।



