২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার, ইরান তার আকাশপথ পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ বিবৃতির পর এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। ট্রাম্প জানান যে, তিনি এই মর্মে নিশ্চয়তা পেয়েছেন যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা হয়েছে এবং পূর্বে পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ডগুলো কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আকাশপথ বন্ধের এই সময়সীমা স্থানীয় সময় সকাল ৭:৩০ মিনিট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, যার ফলে অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে বিকল্প পথে সরিয়ে নিতে হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর ইরানের নিজস্ব বিমান সংস্থা মহান এয়ার (Mahan Air), ইয়াজদ এয়ারওয়েজ (Yazd Airways) এবং আভা এয়ারলাইন্স (AVA Airlines) সবার আগে তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু করে। এর আগে ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি 'অন্য পক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র' থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেয়েছেন যে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ হয়েছে, যা মূলত দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী এরফান সুলতানির ভাগ্য নিয়ে নতুন মোড় এসেছে। এর আগে তার মৃত্যুদণ্ডের প্রবল আশঙ্কা থাকলেও ১৫ জানুয়ারি ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না। তবে তার বিরুদ্ধে আইনি তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) এর আগে বিক্ষোভে ২৫০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর দিয়েছিল। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে তারা মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ উসকে দিতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে প্রচার করছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংকট এবং মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ার ফলে ইরানে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা এখন চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল, যার মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রয়েছেন, তারা ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কৌশলগত ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (USS Abraham Lincoln) এর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী দল পাঠিয়েছে, যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাভুক্ত এলাকায় পৌঁছাবে। এছাড়া সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত রয়েছেন।
ইরানে গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা পরিষেবা বিচ্ছিন্ন রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। যদিও বর্তমান সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে, তবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এখনো কাটেনি। ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি-এজেই ইতিমধ্যে ১৮ হাজার আটককৃত ব্যক্তির দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ আদালত গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, ১২ জানুয়ারি থেকে ইরানের সাথে বাণিজ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে মার্কিন প্রশাসন তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে একে অপরকে চাপে রাখার কৌশলও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।




