২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আল্টিমেটামের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সংকটে জার্মানি ও নরওয়ের মতো দেশগুলো তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় তারা নিজ দেশের নাগরিকদের অবিলম্বে ইরান ত্যাগের জরুরি পরামর্শ দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তেহরানকে একটি কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেন। তিনি মার্কিন দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন সময় দিয়েছেন, অন্যথায় "খুব খারাপ কিছু" ঘটার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। এই উত্তেজনার প্রতিক্রিয়ায় নরওয়ে তাদের প্রায় ৬০ জন সৈন্যের একটি প্রশিক্ষণ মিশনের কর্মীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, জার্মান সশস্ত্র বাহিনী বা বুন্দেসওয়েয়ার ইরাকের ইরবিল ঘাঁটিতে তাদের কর্মী সংখ্যা কমিয়ে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কিছু কর্মীকে জর্ডানে স্থানান্তরিত করেছে।
জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার জন্য জোরালো তাগিদ দিয়েছে। তেহরানে জার্মান দূতাবাসের কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনায় সেখানে কনস্যুলার সহায়তা সীমিত হয়ে পড়েছে। পোল্যান্ড এবং সুইডেনও একই ধরনের জরুরি সতর্কতা জারি করেছে, যা ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে একটি সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়। এর জবাবে ইরান অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা মার্কিন আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে "চূড়ান্ত" জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেহরান এই অঞ্চলের সকল "শত্রু বাহিনীর" ঘাঁটি ও সম্পদকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছে।
শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে তেহরান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীর একটি অংশে সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। সেখানে রাশিয়া ও চীনের অংশগ্রহণে "মেরিটাইম সিকিউরিটি বেল্ট - ২০২৬" শীর্ষক নৌ-মহড়া পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী তেল রপ্তানির জন্য এই প্রণালীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৮৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ব্যর্থতা, যদিও ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ওয়াশিংটনের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা। তবে তেহরানের কাছে এই শর্তগুলো অগ্রহণযোগ্য, কারণ তারা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করতে সীমিত সামরিক হামলার কথা বিবেচনা করছে। ইসরায়েল বাদে অন্য কোনো ন্যাটো মিত্রকে এই সম্ভাব্য অভিযানের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই পদক্ষেপ মূলত একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, যা নির্দেশ করে যে সংকট সমাধানের কূটনৈতিক পথ দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর এই পিছুটান মূলত একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়ানোর এবং তাদের নাগরিকদের জানমাল রক্ষার কৌশল। যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।



