মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডেনমার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে ক্রয় করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের একগুঁয়েমি এই সংকটের মূলে রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি, শনিবার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। সেখানে তারা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক অংশীদারিত্বের অপূরণীয় ক্ষতি করবে এবং পরিস্থিতিকে একটি বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। আর্কটিক অঞ্চলে চলমান সমন্বিত সামরিক মহড়ার প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বর্তমানে প্যারাগুয়ে সফরে রয়েছেন। সেখানে মেরকোসুর (MERCOSUR) এর সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরকালে তারা সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্থনৈতিক চাপের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি জরুরি বৈঠকে তলব করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আসা এই শুল্কের হুমকিতে বলা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আটটি নির্দিষ্ট ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। পরবর্তীতে একই বছরের জুন মাসে এই শুল্কের হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্যভুক্ত দেশগুলো হলো—ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড। মূলত গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন দাবিকে সমর্থন করতে অস্বীকার করার কারণেই এই দেশগুলোকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। জানা গেছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক মনে করেন, বিশেষ করে তাদের 'গোল্ডেন ডোম' (Golden Dome) নামক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের জন্য এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই উত্তেজনার তীব্রতা বৃদ্ধি পায় ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর। সেই বৈঠকে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মটজফেল্ডের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দলটি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দ্বীপটি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার জন্য রাজি করাতে পারেননি। ডেনমার্কের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট 'রেড লাইন' বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া সত্ত্বেও মার্কিন অবস্থান বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হয়নি বলে ডেনিশ কূটনীতির প্রধান অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে নিশ্চিত করেছেন।
কূটনৈতিক চাপ এবং শুল্কের হুমকির মুখে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে তার সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে সেখানে 'অপারেশন আর্কটিক এনডুরেন্স' (Operation Arctic Endurance) নামে ডেনমার্কের নেতৃত্বে একটি বিশেষ সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে। এই মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় মিত্র দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করা। এতে ফ্রান্সের ১৫ জন, জার্মানির ১৩ জন, নরওয়ের ২ জন এবং সুইডেনের সীমিত সংখ্যক সৈন্য অংশ নিয়েছে, যেখানে যুক্তরাজ্য থেকে একজন উচ্চপদস্থ অফিসার পাঠানো হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই শুল্কের হুমকিকে 'অগ্রহণযোগ্য' এবং 'সম্পূর্ণ ভুল' বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। স্টারমার বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল গ্রিনল্যান্ডবাসী এবং ডেনিশ সরকারের।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যুতে গভীর বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদল মার্কিন সিনেটর একটি দ্বিপাক্ষিক বিল উত্থাপন করেছেন, যেখানে ন্যাটোভুক্ত মিত্র দেশগুলোর সম্মতি ছাড়া তাদের কোনো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে পেন্টাগনের তহবিল ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় নেতারা এই অর্থনৈতিক জবরদস্তির মুখে ঐক্যবদ্ধ এবং সমন্বিত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোয়েলস লুন্ড পৌলসেন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, দ্বীপের নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় অবশ্যই মিত্রদের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি ২০২৬ সালে কেবল বিশ্ব বাণিজ্য স্থিতিশীলতাকেই নয়, বরং দীর্ঘদিনের ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক জোটের মৌলিক ভিত্তিকেও এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে।




