২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মকর্তাদের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি গুচ্ছ অনুমোদন করেছে। ইরানে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের প্রধান সামরিক-রাজনৈতিক শক্তি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-কে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
ইউরোপীয় কূটনীতির প্রধান কায়া কাল্লাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এই পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তার মতে, যে শাসনব্যবস্থা নিজের হাজার হাজার নাগরিককে হত্যা করে, তারা আসলে নিজেদের পতনের পথ নিজেরাই প্রশস্ত করে।
নতুন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রায় ৩০টি ইরানি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাদের ওপর আর্থিক লেনদেন এবং ভিসা সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে সরাসরি জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো-র নেতৃত্বে দেশটি স্পেন ও ইতালির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠনের মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে এই সংগঠনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা এখন থেকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর সদস্যদের ইউরোপে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে কায়া কাল্লাস উল্লেখ করেছেন যে, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথগুলো এখনই পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না।
ইরানের এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকট। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে জাতীয় মুদ্রার ব্যাপক দরপতনের ফলে প্রথম বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। এক বছরের ব্যবধানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মান প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সরকারি হিসাবেই মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ৭০ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ ও তথ্য অবরোধ আরোপ করায় সেখানে প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩,৯১৯ জনের মৃত্যু এবং ২৪,৭০০ জনকে আটকের তথ্য দিয়েছে। তবে অন্যান্য প্রতিবেদন, বিশেষ করে ব্রিটিশ সাময়িকী টাইম-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
টাইম ম্যাগাজিন ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে জানিয়েছে যে, ২০২৬ সালের ৮ ও ৯ জানুয়ারির মতো উত্তাল দিনগুলোতে নিহতের সংখ্যা ৩০,০০০ থেকে ৩৬,৫০০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদিও ইরান সরকার ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩,১১৭ জনের মৃত্যুর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি রপ্তানির ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন মোতায়েন করেছে।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে একটি অবিচারী শাসন বা আনরেখটস্-রেজিম হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই; তারা ইউরোপের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী পরিণতির হুমকি দিয়েছে। সব মিলিয়ে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সম্পর্ক এখন এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।




