৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, শনিবার গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে অন্তত ৩২ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এই প্রাণঘাতী হামলাটি এমন এক সংকটময় মুহূর্তে পরিচালিত হয়েছে যখন মিশরের সাথে রাফাহ সীমান্ত পারাপার আংশিকভাবে পুনরায় চালু করার প্রস্তুতি চলছিল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে এই দিনটির শেষ নাগাদ নিহতের মোট সংখ্যা ৫৩০ জন ছাড়িয়ে গেছে, যা অঞ্চলের মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। আইডিএফ-এর দাবি অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাফাহ অঞ্চলের একটি সুড়ঙ্গ থেকে আটজন ফিলিস্তিনি যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেছিল, যা অক্টোবর চুক্তির পরিপন্থী। এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের চারজন সিনিয়র কমান্ডার এবং অন্যান্য সদস্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও, কেন্দ্রীয় গাজায় অবস্থিত হামাসের অস্ত্রাগার, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ।
হামাস এই বিমান হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে একে একটি পরিকল্পিত আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। হামাসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের ধারাবাহিক হামলা প্রমাণ করে যে ইসরায়েলি প্রশাসন গাজা উপত্যকায় তাদের চলমান নৃশংসতা এবং ধ্বংসাত্মক নীতি থেকে সরে আসেনি, বরং তারা এই অঞ্চলকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলোর তথ্যমতে, এই হামলার প্রধান শিকার হয়েছেন সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। ইসরায়েলি বিমানগুলো আবাসিক এলাকা, বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু এবং পুলিশ স্টেশনগুলোতে বোমাবর্ষণ করেছে। গাজা সিটি, খান ইউনিস এবং আল-মাওয়াসি অঞ্চলে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। রিমাল এবং শেখ রাদওয়ান এলাকার একটি পুলিশ স্টেশনে হামলায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে; পুলিশ সাতজনের কথা বললেও স্থানীয় সূত্রগুলো ১১ জন নিহতের দাবি করেছে। খান ইউনিসের একটি শরণার্থী শিবিরে হামলায় এক শিশুসহ একই পরিবারের সাতজন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে, যা ওই দিনের মোট শিশু নিহতের সংখ্যাকে অন্তত সাতে নিয়ে গেছে।
১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে রাফাহ সীমান্ত খোলার যে পরিকল্পনা ছিল, এই হামলার ফলে তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে ঘোষণা করেছিলেন যে, ২৬ জানুয়ারি ইসরায়েলি জিম্মি সার্জেন্ট রান গভিলির মৃতদেহ হস্তান্তরের প্রেক্ষিতে সীমান্তটি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। যদিও মার্কিন প্রশাসন মানবিক কারণে সীমান্তটি দ্রুত খুলে দেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছিল, ইসরায়েল তাদের কঠোর নিরাপত্তা শর্তাবলী এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে তা বিলম্বিত করছিল। বর্তমান পরিস্থিতি এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মিশর, কাতার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অর্জিত অক্টোবর মাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বারবার অভিযোগ করে আসছে যে ইসরায়েল এই চুক্তির শর্তাবলী মানছে না; গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির প্রথম মাসেই ইসরায়েলি বাহিনী ২৮২ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। ইউনিসেফ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত শান্তি প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানোর যে কূটনৈতিক আশা ছিল, এই নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতা সেই আশার ওপর কালো ছায়া ফেলেছে।



