ভিয়েতনামের পার্টি সাধারণ সম্পাদক টো ল্যাম তাঁর প্রতিনিধিদল নিয়ে গত ১০ই অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে পিয়ংইয়ং-এ এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে যান, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই সফরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি প্রায় দুই দশকের মধ্যে কোনো ভিয়েতনামী শীর্ষ নেতার উত্তর কোরিয়া সফর। এই সফরের মূল আকর্ষণ ছিল ভিয়েতনাম এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর, যা কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য এবং তথ্য আদান-প্রদানের মতো কৌশলগত ক্ষেত্রগুলিতে দুই রাষ্ট্রের অঙ্গীকারকে সুদৃঢ় করেছে।
স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলির মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুটির মধ্যেকার সহযোগিতা চুক্তি, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারস্পরিক সমর্থন বৃদ্ধি করবে। এছাড়াও, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা নিরাপত্তা ও সামরিক ক্ষেত্রে যৌথ কার্যক্রমের রূপরেখা দেবে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো চিকিৎসা জ্ঞান ও সম্পদের আদান-প্রদান। ভিয়েতনাম নিউজ এজেন্সি (VNA) এবং কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (KCNA)-এর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি চুক্তি এবং ভিয়েতনাম চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও উত্তর কোরিয়ার চেম্বার অফ কমার্সের মধ্যে বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।
এই ঐতিহাসিক সফরটি উত্তর কোরিয়ার শাসক দল ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠার ৮০তম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে যায়, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক গভীর মাত্রা প্রদান করে। ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৫০ সালে স্থাপিত হয়েছিল, যা প্রায় ৭৫ বছরের ঐতিহ্য বহন করে। এই চুক্তি স্বাক্ষরগুলি দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং বহুমুখী সহযোগিতাকে গভীর করার সংকল্পের প্রতিফলন। যদিও চুক্তিগুলির নির্দিষ্ট শর্তাবলী এখনও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে হ্যানয় এবং পিয়ংইয়ং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কৌশলগতভাবে এগিয়ে যেতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরটি ভিয়েতনামের 'বাঁশ কূটনীতি'-র একটি চাল, যা বৃহত্তর শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে হ্যানয়ের স্বাধীন অবস্থানকে তুলে ধরে। ঐতিহাসিকভাবে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালীন উত্তর কোরিয়া ভিয়েতনামকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করেছিল। বর্তমানে, ভিয়েতনাম তার সফল অর্থনৈতিক সংস্কার 'দই মই' প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বিনিময়ের মাধ্যমে একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে আগ্রহী, যেমনটি অতীতে মার্কিন-উত্তর কোরিয়া শীর্ষ বৈঠকের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। এই নতুন চুক্তিগুলি সেই পথেরই একটি অংশ, যা দুই দেশের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এক নতুন, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করছে।



