২০২৬ সালের ১৮ মার্চ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক এবং দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে একগুচ্ছ জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যস্তর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান বিরোধী সামরিক অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি অংশগ্রহণের ফলে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্প প্রশাসন ১৯২০ সালের ঐতিহাসিক 'জোন্স অ্যাক্ট' সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া এই বিশেষ ছাড়টি আগামী ৬০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে। সাধারণত, জোন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য পরিবহনের জন্য অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত, মার্কিন পতাকাবাহী এবং মার্কিন ক্রু দ্বারা পরিচালিত জাহাজ ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই পদক্ষেপের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, তেলের বাজারের স্বল্পমেয়াদী সংকট দূর করতে এবং তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও সারের মতো অত্যাবশ্যকীয় সম্পদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই ৬০ দিনের শিথিলতা প্রদান করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ অফিস (OFAC) ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি 'পেট্রোলিওস ডি ভেনিজুয়েলা এস.এ.' (PDVSA)-এর ওপর আরোপিত দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্যভাবে শিথিল করেছে। নতুন একটি সাধারণ লাইসেন্স জারির মাধ্যমে এখন মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনিজুয়েলার তেল উত্তোলন, রপ্তানি, বিপণন, সংরক্ষণ এবং পরিশোধনের পূর্ণ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি মূলত ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গৃহীত ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোরই একটি অংশ, যা ভেনিজুয়েলার তেল শিল্পকে পুনরায় বিশ্ববাজারের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত করছে।
তবে এই বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে ট্রাম্প প্রশাসন। ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রয় থেকে অর্জিত সমস্ত অর্থ সরাসরি মার্কিন নিয়ন্ত্রিত বিশেষ অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে, যা পরবর্তীতে দেশটির বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। এই লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু কঠোর ভূ-রাজনৈতিক শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া বা কিউবার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনো ধরনের লেনদেন করা যাবে না। এছাড়া চীনের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত কোম্পানিগুলোকেও এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালে মাদুরো সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে সেই নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাজারের অস্থিরতা কমাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত রিজার্ভ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও ৬.৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জোন্স অ্যাক্ট স্থগিত করার ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য পেট্রোলের দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা হয়তো খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। অন্যদিকে, ২০১৬ সাল থেকে ভেনিজুয়েলার তেল উৎপাদন প্রায় ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই খাতে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ ভেনিজুয়েলার তেল উৎপাদন পুনরায় নিষেধাজ্ঞা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই বহুমুখী উদ্যোগগুলো মূলত মার্কিন অর্থনীতিকে বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করার একটি মরিয়া চেষ্টা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট কাটিয়ে উঠতে এই আইনি শিথিলতা এবং কূটনৈতিক কৌশল কতটুকু কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য কেবল আইনি পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।



