পশ্চিম আফ্রিকায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা নিয়ে ব্রাসেলসের উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে সেনেগালকে ‘ইউরোপীয় শান্তি তহবিল’ (European Peace Facility) থেকে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল। কাউন্সিলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় সেনেগালিজ নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা আরও জোরদার করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল বাজেটের বাইরে থেকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য ‘ইউরোপীয় শান্তি তহবিল’ গঠন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সেনেগালকে দেওয়া সহায়তার মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই উদ্যোগগুলো শুধু সেনেগালে নয়, বরং গোটা সাহেল অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সেনেগাল তার দীর্ঘকালীন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং সাম্প্রতিক কোনো সামরিক অভ্যুত্থান না হওয়ার কারণে স্বতন্ত্র অবস্থানে রয়েছে। মালি, নাইজার এবং বুর্কিনা ফাসোর মতো দেশগুলোতে যখন সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে, তখন ডাকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে টিকে আছে। ইইউ-র এই সমর্থন এই ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং অস্থিরতা যেন আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে তা রোধ করতে সহায়ক হতে পারে।
এই অংশীদারিত্বের পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুমুখী স্বার্থ রয়েছে। একটি স্থিতিশীল সেনেগাল আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগর দিয়ে অভিবাসীদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার পাশাপাশি বাজার ও প্রাকৃতিক সম্পদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে। এছাড়া, এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে সক্রিয় থাকা রাশিয়ার বেসরকারি সামরিক সংস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করারও এটি একটি কৌশল। তবে সরকারি বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই সহায়তা পুরোপুরি রক্ষণাত্মক প্রকৃতির এবং এতে ইউরোপীয় বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপ ও সেনেগালের সম্পর্কের মূলে ঔপনিবেশিক অতীত থাকলেও বর্তমানে তা একটি সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব হিসেবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। ‘ইউরোপীয় শান্তি তহবিল’ ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিজস্ব কিছু অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এবং সংকটে দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম হচ্ছে। এটি আফ্রিকার বিষয়ে নিজস্ব বাজেটীয় নিয়মনীতি লঙ্ঘন না করেই আরও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইউরোপীয় পররাষ্ট্রনীতির বিবর্তনকে ফুটিয়ে তোলে।
সেনেগালের সাধারণ মানুষের কাছে এই সহায়তার অর্থ হতে পারে নিরাপত্তা বাহিনীর উন্নত প্রশিক্ষণ এবং সম্ভবত সীমান্ত অঞ্চলে সহিংসতার মাত্রা হ্রাস। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে কতটা দক্ষতার সাথে এই সম্পদ ব্যবহার করতে পারে এবং ইকোওয়াস (ECOWAS)-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সাথে কতটা সমন্বয় বজায় রাখতে পারে তার ওপর।
পরিশেষে, এই উদ্যোগটি স্পষ্ট করে দেয় যে নিরাপত্তার প্রশ্নে ইউরোপ ও আফ্রিকার ভাগ্য কতটা নিবিড়ভাবে জড়িত এবং স্থানীয় অংশীদারদের পেছনে বিনিয়োগ উভয় পক্ষের জন্যই সুফল বয়ে আনতে পারে।



