জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুহল গত ৫ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্ক রাজ্যের মালিকানা পুনঃনিশ্চিত করেছেন। এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন দ্বীপটি কেনার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জার্মান কূটনীতিকের এই মন্তব্যটি লিথুয়ানিয়া সফরের সময় এসেছিল এবং এটি আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিরল ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ওয়াডেফুহল স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ‘গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এবং তিনি ন্যাটো কাঠামোর অধীনে দ্বীপটির প্রতিরক্ষা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া, যেখানে ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ডকে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য’ বলে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটন দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থানের ওপর জোর দিচ্ছে—এটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটো, রাশিয়া ও চীনের স্বার্থ যেখানে ছেদ করে, সেখানে এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডে বিরল খনিজ ধাতুর বিশাল ভান্ডার রয়েছে, যা চীনা রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পশ্চিমা শিল্পের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে কোপেনহেগেন এবং নুক উভয় স্থান থেকেই বারবার বলা হয়েছে যে দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আলোচনা ‘কেনা’ বা ‘দখল’ করার শর্তে হতে পারে না। এই সম্পদ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়লেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। আলোচনা কেবল আন্তর্জাতিক ভিত্তিতেই সম্ভব।’ তাঁর এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মিত্র হলেও তাদের ডেনমার্ক রাজ্যের ভূখণ্ডের ওপর দাবি জানানোর কোনো আইনি অধিকার নেই। এই বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন ডেনমার্ককে কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে।
আসলে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জটিল হতে শুরু করে ২০২২ সালের শেষের দিকে, যখন ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থা প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকান কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ জরুরি ‘নাইট ওয়াচ’ ব্যবস্থা চালু করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে ডেনমার্ক কতটা সতর্ক ছিল।
বর্তমানে জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো ডেনমার্কের প্রতি তাদের দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি এবং সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তাকে সমর্থন জানিয়েছে। এই ঐকমত্য কেবল আর্কটিক সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার ইঙ্গিত দেয় না, বরং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে মিত্ররা কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, তারও প্রতিফলন ঘটায়। ইউরোপীয় দেশগুলোর এই সম্মিলিত অবস্থান স্পষ্ট করে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা বদ্ধপরিকর।



