চীন ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের জন্য তাদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য কেবল যেকোনো মূল্যে অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করা নয়, বরং প্রবৃদ্ধির পুরো প্রক্রিয়াটিকেই বদলে ফেলা। এতদিন চীনের অর্থনৈতিক মডেল আবাসন খাত, রপ্তানি এবং বিশাল অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এখন দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স, কম্পিউটিং অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
পরিকল্পনার মৌলিক সূচকগুলো থেকেই এই পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের জন্য বেইজিং ৪.৫% থেকে ৫% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা আগের দশকের দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি সংযত। এটি কেবল সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নয়। চীন কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে যে, সহজ প্রবৃদ্ধির যুগ শেষ হয়েছে। এখন গতির চেয়ে অর্থনৈতিক ভিত্তির গুণগত মান নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নতুন কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ব্যয় প্রতি বছর অন্তত ৭% বৃদ্ধি করা হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির মূল খাতগুলোর অবদান জিডিপির ১২.৫% এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, চিপ নির্মাণ, সিক্স-জি (6G), বায়োমেডিসিন, মহাকাশ গবেষণা এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন করা হবে। লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিকে কেবল একটি আলাদা খাত হিসেবে নয়, বরং কারখানা থেকে শুরু করে লজিস্টিকস এবং প্রতিরক্ষা পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।
এই পরিবর্তনের কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। চীন এমন এক বিশ্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে যেখানে উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আর নিশ্চিত নয়। চিপ এবং যন্ত্রপাতির ওপর মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বেইজিংকে প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। তাই এই নতুন পরিকল্পনাটি কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক চাপের একটি কৌশলগত জবাব। চীন এখন বাইরের দেশের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদন করতে চায়।
তবে এই কর্মসূচি কেবল শিল্প নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিং একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরির ওপরও জোর দিচ্ছে। এটি একটি স্বীকৃতি যে, দেশটি চিরকাল রপ্তানি এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোগ পূরণ করতে পারবে না। আবাসন খাতের সংকট, সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী মনোভাব এবং শ্রমবাজারের অস্থিরতা কর্তৃপক্ষকে এমন একটি প্রবৃদ্ধির মডেল খুঁজতে বাধ্য করছে যা কেবল উৎপাদন নয়, বরং কর্মসংস্থান, আয় এবং ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাসকেও সমর্থন করবে।
অবশ্য এই পরিকল্পনার কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। উচ্চ-প্রযুক্তিগত উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব চীনের অর্থনীতির পুরনো ভারসাম্যহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পর্যাপ্ত না হলে অতিরিক্ত উৎপাদনের ঝুঁকি তৈরি হবে। সহজ কথায়, দেশটি আরও জটিল পণ্য তৈরি করতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো বিক্রির জন্য আগের মতোই বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এটি নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, পরিবেশগত লক্ষ্যগুলো বেশ পরিমিত। এখানে কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেয়ে কার্বন তীব্রতা কমানোর ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
মূল কথা হলো, চীন এখন আর কেবল "দ্রুত প্রবৃদ্ধি" অর্জনের চেষ্টা করছে না। তারা একটি প্রযুক্তি নির্ভর এবং টেকসই মডেল তৈরি করছে যেখানে বিজ্ঞান, কম্পিউটিং ক্ষমতা, জ্বালানি এবং শিল্প সমন্বয় হবে প্রধান সম্পদ। এই কৌশলে ঝুঁকি থাকলেও, এটি স্পষ্ট করে দেয় যে আগামী দশকে বেইজিং নিজেকে কোথায় দেখতে চায়। চীন আর বিশ্বের সস্তা পণ্যের কারখানা হিসেবে থাকতে চায় না, বরং তারা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত শক্তির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়।



