ফরাসি বিমান বাহিনীর কর্নেল সোফি আদেনো, যিনি ২০২২ সালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-র মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) তার প্রথম মহাকাশ অভিযান 'এপসিলন' (Crew-12)-এর জন্য কঠোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে ক্লোদি হাইনিয়েরে-র অভিযানের দীর্ঘ ২৫ বছর পর এই প্রথম কোনো ফরাসি নারী মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছেন। পেশায় একজন হেলিকপ্টার পরীক্ষামূলক পাইলট হওয়া সত্ত্বেও, আদেনো জানিয়েছেন যে তার প্রশিক্ষণের মধ্যে চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রস্তুতিগুলোই তাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে, যা আধুনিক মহাকাশচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় বহুমুখী দক্ষতার গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে।
আডেনো-র প্রশিক্ষণের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জরুরি চিকিৎসা প্রোটোকল আয়ত্ত করা, যা দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ অভিযানের বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে মহাকাশচারীদের নিজেদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হতে হয়। এই ক্রস-ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে আদেনো কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR) এবং দাঁতের ক্যাভিটি ফিলিং বা ক্রাউন মেরামতের মতো প্রাথমিক ডেন্টাল সার্জারির অনুশীলন করছেন। এছাড়া রক্ত সংগ্রহ এবং ইন্ট্রাভেনাস (IV) ও ইন্ট্রাঅসিয়াস (IO) ইনফিউশন স্থাপনের মতো জটিল প্রক্রিয়াগুলোও তাদের শিখতে হচ্ছে, যাতে তারা প্রয়োজনে নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা করতে পারেন।
'এপসিলন' মিশনটি প্রায় নয় মাস স্থায়ী হবে এবং এতে আনুমানিক ২০০টি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নাসা-র আইএসএস অভিযানের আদর্শ মেয়াদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই গবেষণার মধ্যে রয়েছে 'ChlorISS' নামক একটি শিক্ষামূলক প্রকল্প, যেখানে স্কুল শিক্ষার্থীরা মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা ওজনহীন পরিবেশে উদ্ভিদ জন্মানোর প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে পারবে। ২০২২ সালে ইএসএ-র গ্রুপে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আদেনো-র এই প্রস্তুতি পর্বটি দুই বছর নয় মাস ধরে চলছে। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি জার্মানির কোলনে অবস্থিত ইউরোপীয় মহাকাশ কেন্দ্রে (EAC) তার প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন হয়।
ক্রু-১২ (Crew-12) মিশনের উৎক্ষেপণ ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার নির্ধারিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১১ ফেব্রুয়ারি উৎক্ষেপণের কথা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এই অভিযানে আদেনো-র সঙ্গী হিসেবে থাকছেন নাসা-র মহাকাশচারী জেসিকা মেয়ার ও জ্যাক হ্যাথাওয়ে এবং রুশ মহাকাশচারী আন্দ্রে ফেদিয়ায়েভ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণে ক্রু-১১ মিশনের মহাকাশচারীদের নির্ধারিত সময়ের আগে পৃথিবীতে ফিরে আসার ঘটনাটি মহাকাশে জরুরি স্বাস্থ্য প্রস্তুতির গুরুত্বকে আরও জোরালো করেছে।
দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ কর্মসূচিতে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই প্রস্তুতি অত্যন্ত সহায়ক হবে। সোফি আদেনো-র এই যাত্রা কেবল ফ্রান্সের জন্য নয়, বরং সমগ্র ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণার জন্য একটি মাইলফলক। তার এই নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক লক্ষ্যগুলো ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের পথকে আরও সুগম করবে। মহাকাশের বিরূপ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য যে মানসিক ও শারীরিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, আদেনো তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছেন। এই মিশনের সাফল্য আগামী দিনে আরও অনেক নারীকে মহাকাশ বিজ্ঞানে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



