আজারবাইজান ও চীনের সবুজ শক্তি খাতে সহযোগিতার নতুন কৌশল
পরিবর্তনের শক্তি: আজারবাইজানের ‘সবুজ স্বপ্ন’ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Nataly Lemon
আজারবাইজান বর্তমানে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানি খাতের রূপান্তরে এক অভাবনীয় গতি অর্জন করেছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ রাজধানী বাকু শহরে আজারবাইজানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং পাওয়ারচায়না রিসোর্সেস লিমিটেডের (Powerchina Resources Ltd.) মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জ্বালানি মন্ত্রী পারভিজ শাহবাজোভের (Parviz Shahbazov) প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পাওয়ারচায়নার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হে শিউ (He Shiyou) উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি আজারবাইজানের সাথে তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বৈঠকটি মূলত দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
এই বিশাল সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রকল্প, যার মধ্যে ১৬০ মেগাওয়াট (MW) ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশাল সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অন্যতম। এর পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরের বিশাল জলরাশিতে অফশোর উইন্ড পার্ক বা সমুদ্রতীরবর্তী বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ গিগাওয়াট (GW) পর্যন্ত হতে পারে। এই ধরনের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো কেবল আজারবাইজানের জ্বালানি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং এগুলো দেশটির আধুনিক ‘সবুজ অর্থনীতি’ বা গ্রিন ইকোনমির এক শক্তিশালী ও দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করবে।
আজারবাইজান তাদের জাতীয় জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং উচ্চাভিলাষীভাবে নির্ধারণ করেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট ৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে এবং এই ধারা অব্যাহত রেখে ২০৩৩ সালের মধ্যে তা ৮ গিগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা সফলভাবে জাতীয় গ্রিডে সমন্বিত করার জন্য চীনের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইপিপিইআই (EPPEI) কারিগরি পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করবে। তারা মূলত আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে আজারবাইজানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই এই সবুজ শক্তি ব্যবহার করা যায়।
আজারবাইজানের অর্থনীতি মন্ত্রী মিকাইল জাব্বারোভ (Mikayil Jabbarov) পাওয়ারচায়নার প্রতিনিধিদের সাথে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন, যেখানে হাজিগাবুল (Hajigabul) জেলায় একটি নতুন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই প্রকল্পটি আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা সোকার গ্রিন (SOCAR Green) এর সাথে যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার একটি প্রধান দিক ছিল ইন্টেলিজেন্ট গ্রিড বা স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তুলবে। বিশেষ করে, ক্রমবর্ধমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য যে বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তা এই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আজারবাইজানের জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির অবদান ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০.৯ শতাংশ বা প্রায় ১,৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে। তবে আজারবাইজান এখানেই থেমে থাকতে রাজি নয়; তাদের লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালের মধ্যে এই হারকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা দ্রুতগতিতে কাজ করে যাচ্ছে এবং ইতিমধ্যে চায়না ডাতাং (China Datang) সহ বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রায় ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই বিশাল বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আজারবাইজানের দৃঢ় সংকল্পেরই বহিঃপ্রকাশ।
চীনের সাথে এই নিবিড় অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আজারবাইজান কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই করছে না, বরং একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং উদ্ভাবনী জ্বালানি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। সৌর এবং বায়ু শক্তি এখন এই অঞ্চলের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে। এই রূপান্তর কেবল পরিবেশ রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আজারবাইজানের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করার একটি প্রয়াস। এই সবুজ বিপ্লব আজারবাইজানকে মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের জ্বালানি করিডোরে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, আজারবাইজানের জ্বালানি মন্ত্রী পারভিজ শাহবাজোভ তার বক্তব্যে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল দর্শনটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, “ভবিষ্যতের জ্বালানি শক্তি মূলত জন্ম নেয় পারস্পরিক গভীর বিশ্বাস এবং অভিন্ন লক্ষ্যের ঐক্য থেকে। আমরা এখানে কেবল ভৌত অবকাঠামো বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করছি না, বরং আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ এবং আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছি।” তার এই অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য আজারবাইজানের চলমান জ্বালানি বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা দেশটিকে একটি সবুজ ও সমৃদ্ধশালী আগামীর দিকে ধাবিত করছে।
উৎসসমূহ
Azertag News-Agency
Trend.Az
Eurasia Review


