গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি অত্যাধুনিক "স্মার্ট বালিশের" প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন, যা মূলত ঘুমানোর আগে স্মার্টফোনের প্রতি মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছে। বর্তমান যুগে আমরা অনেকেই পডকাস্ট, শান্ত সংগীত বা অডিওবুক শুনতে শুনতে ঘুমাতে পছন্দ করি, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বারবার ফোন হাতে নেওয়া বা উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকানো আমাদের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এই নতুন উদ্ভাবনটি একটি সাধারণ বালিশের কভারের ভেতরে উন্নত স্পিকার এবং সেন্সর প্রযুক্তিকে এমনভাবে সমন্বিত করেছে, যাতে ব্যবহারকারী কেবল মাথা বা হাতের সামান্য নড়াচড়ার মাধ্যমেই অডিওর ভলিউম বা প্লেব্যাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এর ফলে ঘুমের আগে নীল আলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে চোখ ও মস্তিষ্ক রক্ষা পায় এবং ব্যবহারকারী অনেক বেশি প্রশান্তি অনুভব করেন।
এই বিশেষ প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ৯ মার্চ শিকাগোতে আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ টিইআই’২৬ (TEI’26) কনফারেন্সে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করা হয়। স্কুল অফ কম্পিউটিং সায়েন্সের ডক্টর শিয়াংহুয়া "শ্যারন" ডিং-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ গবেষক দল এই প্রযুক্তির ওপর কাজ করছেন। তাদের গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য সুরক্ষা। সাধারণত বাজারে থাকা ফিটনেস ব্যান্ড বা স্লিপ ট্র্যাকারগুলো শুধুমাত্র ঘুমের মান বা সময়কাল পরিমাপ করে থাকে, কিন্তু ডক্টর ডিং-এর দল ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে সরাসরি একটি আরামদায়ক গৃহস্থালি পণ্যের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, প্রযুক্তির ব্যবহার এমন হওয়া উচিত যা মানুষের বিশ্রামের সময়কে আরও নিরবচ্ছিন্ন এবং আনন্দদায়ক করে তুলবে, কোনো বাড়তি ডিজিটাল জটিলতা ছাড়াই।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই বালিশের প্রাথমিক সংস্করণটি ছিল অত্যন্ত সহজ ও ব্যবহারবান্ধব। ব্যবহারকারী যখন বালিশটি জড়িয়ে ধরতেন, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর ভেতরে থাকা স্পিকারটি চালু হয়ে যেত এবং বালিশটি ছেড়ে দিলে শব্দ বন্ধ হয়ে যেত। স্মার্টফোনের একটি ডেডিকেটেড অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের পছন্দের অডিও ফাইল বা স্ট্রিমিং সার্ভিস আগে থেকেই নির্বাচন করে রাখতে পারেন। পরবর্তীতে গবেষকরা এতে আরও সৃজনশীল এবং "লাইভ" নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্ত করেন। বালিশের উপরিভাগে একটি বিড়ালের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং এর "নাক" সদৃশ অংশে একটি স্পর্শকাতর সেন্সর বসানো হয়েছে। এই সেন্সরে আলতো ছোঁয়া দিলে অডিও সাময়িকভাবে বন্ধ বা পুনরায় চালু করা সম্ভব। ঘুমের মধ্যে শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার কারণে যাতে ভুল করে কোনো কমান্ড কার্যকর না হয়, সেজন্য সেন্সরগুলোর সংবেদনশীলতা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে টিউন করা হয়েছে।
এই উদ্ভাবনী প্রোটোটাইপটি ১৬ জন স্বেচ্ছাসেবীর একটি ছোট দলের ওপর পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই এই চমৎকার ধারণাটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং ভবিষ্যতে এতে আরও কিছু নতুন ফিচার যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মূল্যবান প্রস্তাবনার মধ্যে ছিল ঘুমানোর গভীরে যাওয়ার সাথে সাথে শব্দের তীব্রতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসা এবং বালিশের পক্ষ থেকে মৃদু ট্যাকটাইল বা স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়া প্রদান করা। গবেষকদের মতে, এই প্রকল্পটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হতে থাকা "কমফোর্ট টেকনোলজি" বা আরামদায়ক প্রযুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ধারার মূল লক্ষ্য হলো ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামগুলোকে দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসের মধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে রাখা, যাতে তা মানুষের জীবনকে সহজ করে কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বা ডিজিটাল ক্লান্তি তৈরি না করে। বর্তমানে এই গবেষক দলটি তাদের উদ্ভাবিত স্মার্ট বালিশটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাজারে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন শিল্প অংশীদারের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
