২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব সংগীতের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ব্ল্যাকপিঙ্ক (BLACKPINK) ব্যান্ডের জনপ্রিয় সদস্য রোজে এই দিনে প্রথম কে-পপ একক শিল্পী হিসেবে ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস (BRIT Award) জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
ম্যানচেস্টারের কো-অপ লাইভ অ্যারেনায় আয়োজিত ৪৬তম ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে তিনি এই ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ব্রুনো মার্সের সাথে তার গাওয়া 'APT.' গানটি 'ইন্টারন্যাশনাল সং অফ দ্য ইয়ার' বা বছরের সেরা আন্তর্জাতিক গানের বিভাগে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করে।
'APT.' গানটি মূলত ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর রোজের প্রথম একক স্টুডিও অ্যালবাম 'rosie'-এর একটি প্রি-রিলিজ সিঙ্গেল হিসেবে মুক্তি পেয়েছিল। মুক্তির পর থেকেই এটি বিশ্বজুড়ে এক অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সংগীতের প্রচলিত সীমানাকে অতিক্রম করে।
গানটির সাফল্যের পরিসংখ্যান সত্যিই বিস্ময়কর। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী চার্ট 'বিলবোর্ড হট ১০০' (Billboard Hot 100)-এ টানা ৪৫ সপ্তাহ ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল এবং তালিকার ৩ নম্বর স্থান পর্যন্ত আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
এছাড়াও, যুক্তরাজ্যের 'অফিসিয়াল সিঙ্গেলস চার্ট'-এ এটি ২ নম্বর অবস্থানে পৌঁছেছিল। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চার্টে দাপট দেখানোর পর, আইএফপিআই (IFPI) এই গানটিকে ২০২৫ সালের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত আন্তর্জাতিক সিঙ্গেল হিসেবে ঘোষণা করে।
গানটির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- এটি টানা ৪৫ সপ্তাহ বিলবোর্ড চার্টে অবস্থান করে এক বিরল নজির স্থাপন করেছে।
- এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি বিশ্বের শীর্ষ সংগীত চার্টগুলোতে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিল।
- আইএফপিআই-এর মতে এটি ২০২৫ সালের গ্লোবাল বেস্ট-সেলিং সিঙ্গেল হিসেবে স্বীকৃত।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি গান বিশ্বব্যাপী সংগীত তালিকার শীর্ষে পৌঁছেছে যেখানে ইংরেজি বাদে অন্য ভাষার উপাদান ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, অ-ইংরেজি গানগুলো এখন আর কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং বিশ্ব সংগীতের এক নতুন স্বাভাবিকতা বা 'নিউ নরমাল' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রোজের এই ঐতিহাসিক বিজয় কেবল কিছু শুষ্ক পরিসংখ্যানের প্রতিফলন নয়, বরং এটি বিশ্ব সংগীতের গতিপথ পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত। বর্তমানে সংগীত জগত আর নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।
'পাশ্চাত্য' এবং 'প্রাচ্য'—এই দুই মেরুর পার্থক্য এখন ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। ভাষার বাধাগুলো এখন আর কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং শ্রোতাদের সাথে শিল্পীর আবেগীয় সংযোগই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের পর মঞ্চে দাঁড়িয়ে রোজে এক আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি তার এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্য ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর অন্য তিন সহকর্মী—জেনি, জিসু এবং লিসার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
একইসাথে তিনি বিশ্বখ্যাত শিল্পী ব্রুনো মার্সকে তার মেন্টর বা পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিহিত করেন। তার এই বক্তব্যটি বর্তমান যুগে সংগীতের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার গুরুত্বকে আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে, যা একটি নতুন যুগের সূচনা করে।
সংগীত আসলে কোনো নির্দিষ্ট ভাষা বা ব্যাকরণ মেনে চলে না। এটি কেবল হৃদয়ের স্পন্দন এবং সুরের মূর্ছনা বোঝে। 'APT.' গানটি প্রমাণ করেছে যে, মানুষ এখন শব্দের চেয়ে সুরের ভাইব্রেশন বা কম্পনকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
যখন একজন কে-পপ শিল্পী ব্রিটেনের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই সম্মান গ্রহণ করেন, তখন সেটি কেবল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মিলন নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক ঐকতানের জন্ম দেয়। এটি সংস্কৃতির একীভূতকরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, রোজের এই বিজয় বিশ্ব সংগীতের আকাশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। যেখানে কোনো বিভাজন নেই, আছে কেবল সুরের পরম ঐক্য এবং নতুন এক হারমনি যা পুরো পৃথিবীকে একই সুতোয় গেঁথে রাখবে।


