নিউজিল্যান্ডের প্রখ্যাত গায়িকা এবং গীতিকার লর্ড (Lorde) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ২০২৫ সালের শেষে ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের (UMG) সাথে তার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে তার নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি তার সংগীত জীবনের এক নতুন এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন।
২০২৬ সালের ১৮ মার্চ লর্ড তার ভক্তদের উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি বিশেষ ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করেন। তিনি তার এই পদক্ষেপকে একটি "পরিচ্ছন্ন স্লেট" বা নতুন শুরুর সুযোগ এবং "নতুনত্বের প্রতি তীব্র ক্ষুধা" হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা তাকে সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সহায়তা করবে।
ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের সাথে লর্ডের এই দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়েছিল যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি চারটি সফল অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন, যা মূলত তার ক্যারিয়ারের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং তাকে বিশ্বমঞ্চে একজন প্রভাবশালী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
বর্তমানে এই শিল্পী স্বীকার করেছেন যে, তিনি যখন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তখন তিনি তার সৃজনশীল সত্তা এবং তার কাজ ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে সে সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না। এটি কোনো তিক্ত বিচ্ছেদ নয়, বরং একটি অত্যন্ত সচেতন এবং সুপরিকল্পিত জীবনচক্রের সমাপ্তি মাত্র।
লর্ড বর্তমানে তার ২০২৫ সালের সফল অ্যালবাম 'ভার্জিন' (Virgin)-এর সমর্থনে আয়োজিত 'আল্ট্রাসাউন্ড ওয়ার্ল্ড ট্যুর' (Ultrasound World Tour) নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই বিশ্ব সফরের মাঝেই তিনি তার সংগীত জীবনের এই বড় পরিবর্তনের কথা ভক্তদের সাথে শেয়ার করলেন।
তার সর্বশেষ অ্যালবাম 'ভার্জিন' বিলবোর্ড ২০০ চার্টে ২ নম্বর স্থান দখল করেছিল এবং সমালোচকদের সাইট মেটাক্রিটিকে প্রায় ৯০ শতাংশ রেটিং অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে লর্ডের কাছে এখন বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সৃজনশীল স্বাধীনতা, যেখানে বাইরের কোনো বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
এই অ্যালবামে লর্ড মূলত মানুষের শরীর, আত্মপরিচয় এবং অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার মতো গভীর ও জটিল বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তবে তার জীবনের পরবর্তী ধাপটি তিনি কোনো ধরনের বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা বা বাণিজ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই অতিবাহিত করতে চান।
লর্ড তার বর্তমান সৃজনশীল অবস্থাকে "উন্মুক্ততা", "নতুন সম্ভাবনা" এবং "নিরন্তর অনুসন্ধান" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ইতিমধ্যে তার কাজের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং ব্যক্তিগত জায়গা ভাড়া নিয়েছেন যেখানে তিনি তার নতুন সংগীত সাধনা এবং পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি এখন সংগীত তৈরির একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক মডেল গড়ে তুলছেন। আগে যেখানে তিনি তার বিছানা থেকেই অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে এখন তিনি সৃজনশীলতার এক সুপরিকল্পিত স্থাপত্য বা আর্কিটেকচার তৈরি করার দিকে মনোনিবেশ করেছেন।
এই রূপান্তরটি মূলত একজন শিল্পীর মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে থাকার চেয়ে নিজেকে একটি স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে। তিনি এখন নিজের শর্তে এবং নিজের গতিতে তার শিল্পকে পরিচালনা করতে আগ্রহী।
লর্ড আরও জানিয়েছেন যে, তিনি বর্তমানে এমন একটি কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করছেন যেখানে সৃজনশীলতা কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা নেই। এটি তাকে একজন শিল্পী হিসেবে আরও পরিণত এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা তার আগামী দিনের কাজে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তবে তিনি ভবিষ্যতে কোনো বড় রেকর্ড লেবেলের সাথে কাজ করার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। এমনকি প্রয়োজন মনে করলে তিনি পুনরায় ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের সাথেও চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন, তবে আপাতত তিনি নিজের জন্য একটি স্বাধীন ও মুক্ত পরিসর তৈরি করতে চান।
বর্তমানে তার মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সংগীত কেবল বিক্রির জন্য তৈরি হবে না, বরং এটি হবে নিজেকে এবং সুরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার একটি মাধ্যম। তিনি চান তার সংগীত যেন কোনো বাণিজ্যিক চাপে পিষ্ট না হয়ে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল থাকে।
লর্ডের এই সাহসী পদক্ষেপ বিশ্ব সংগীতের বাজারে এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, একজন শিল্পী চাইলে বড় প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে এসেও নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করে বিশ্বজুড়ে সফল হতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায়, লর্ডের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংগীত এখন আর কেবল নিয়ন্ত্রিত কোনো পণ্য নয়, বরং এটি একটি সচেতন পছন্দ এবং আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠছে। তার এই নতুন যাত্রা সংগীতের জগতে এক নতুন ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য এবং স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে আসবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন।



