Charlie Puth Moises-এ Chief Music Officer হিসেবে যোগদান করছেন.
মিউজিশিয়ান যখন কোডিংয়ের দুনিয়ায়: চার্লি পুথ এবং এআই-সংগীতের নতুন অধ্যায়
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
২০২৬ সালের ৪ঠা মার্চ সংগীত জগতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো যখন গ্র্যামি মনোনীত প্রখ্যাত শিল্পী চার্লি পুথ (Charlie Puth) আনুষ্ঠানিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক মিউজিক প্ল্যাটফর্ম 'ময়েসেস' (Moises)-এর চিফ মিউজিক অফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নিয়োগটি বর্তমান সংগীত শিল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতাকে তুলে ধরে, যেখানে প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মগুলো সৃজনশীল প্রক্রিয়ার আরও গভীরে পৌঁছাতে এবং সরঞ্জামগুলোকে আরও কার্যকর করতে পেশাদার সংগীতশিল্পীদের সরাসরি যুক্ত করছে।
আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সৃজনশীলতার এই মেলবন্ধন মূলত সংগীত তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং উন্নত করার লক্ষ্যেই করা হয়েছে। ময়েসেস-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কেবল একটি সফটওয়্যার নয়, বরং শিল্পীদের জন্য একটি অপরিহার্য ডিজিটাল সহকারীতে পরিণত হচ্ছে। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রযুক্তি এবং শিল্পের মধ্যকার দূরত্ব আরও কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তা জেরাল্ডো রামোস (Geraldo Ramos) কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ময়েসেস গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে সংগীতশিল্পীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এই অ্যাপটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০ কোটিরও বেশি এবং এটি ৩৩টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় বিশ্বজুড়ে পরিষেবা প্রদান করছে। প্ল্যাটফর্মটি তার উদ্ভাবনী ফিচারের মাধ্যমে সংগীত জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে শিল্পীরা যা যা করতে পারেন:
- যেকোনো অডিও ফাইল থেকে আলাদা আলাদা স্টেম বা ট্র্যাক পৃথক করা
- গানের সঠিক টোনালিটি বা স্কেল এবং টেম্পো নির্ণয় করা
- সংগীতের বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে নতুন আ্যরেঞ্জমেন্ট তৈরি করা
কোম্পানির মূল দর্শন হলো সংগীতশিল্পীকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং তাদের সৃজনশীল সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা। জেরাল্ডো রামোসের মতে, সংগীত বরাবরই প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো সেই বিবর্তনেরই একটি নতুন এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায়। এটি শিল্পীদের কাজের গতি বাড়িয়ে তাদের মূল সৃজনশীলতায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।
চার্লি পুথকে এই পদের জন্য নির্বাচন করা ময়েসেস-এর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রতীকী একটি সিদ্ধান্ত। তিনি এমন একজন শিল্পী যিনি সংগীতের কারিগরি দিক বা মিউজিক ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। ২০১৩ সালে বার্কলি কলেজ অফ মিউজিক (Berklee College of Music) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই শিল্পী প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখান কীভাবে তিনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ শব্দ থেকে অসাধারণ সুর তৈরি করেন।
চার্লি পুথ ব্যক্তিগতভাবেও ময়েসেস ব্যবহার করেন, বিশেষ করে তার সুপার বোল (Super Bowl) পারফরম্যান্সের প্রস্তুতির সময় তিনি এই প্ল্যাটফর্মের সাহায্য নিয়েছিলেন। তার মতে, আগে স্টুডিওতে যে কাজগুলো করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, এই প্ল্যাটফর্মের এআই সরঞ্জামগুলোর মাধ্যমে তা এখন মাত্র কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এটি স্টুডিওর কর্মদক্ষতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এই নতুন অংশীদারিত্ব উদযাপন করতে চার্লি পুথ এবং ময়েসেস একটি আন্তর্জাতিক রিমিক্স প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। এই প্রতিযোগিতাটি তার আসন্ন অ্যালবাম 'হোয়াটএভারস ক্লেভার!' (Whatever's Clever!)-এর নতুন সিঙ্গেল 'বিট ইয়োরসেলফ আপ' (Beat Yourself Up)-কে কেন্দ্র করে আয়োজিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই অ্যালবামটি ২০২৬ সালের ২৭শে মার্চ মুক্তি পেতে চলেছে।
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ থাকছে:
- ময়েসেস অ্যাপের মাধ্যমে গানটির মূল স্টেমগুলো সংগ্রহ করা
- নিজেদের সৃজনশীলতা ব্যবহার করে গানটির একটি নতুন সংস্করণ তৈরি করা
- প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের কাজ জমা দেওয়া
বিজয়ীদের নাম চার্লি পুথ নিজেই নির্বাচন করবেন, যা উদীয়মান সংগীতশিল্পীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ। এই প্রতিযোগিতার মোট পুরস্কারের পরিমাণ ১,০০,০০০ ডলার। এছাড়া চূড়ান্ত বিজয়ীরা ২৯শে মে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে (Madison Square Garden) চার্লি পুথের কনসার্টে তার সাথে পর্দার আড়ালে বা ব্যাকস্টেজে সরাসরি দেখা করার এক অনন্য সুযোগ পাবেন।
সংগীতের জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়ে চলমান বিশ্বব্যাপী বিতর্কের মধ্যেই এই নিয়োগটি সম্পন্ন হলো। সোনারওয়ার্কস (Sonarworks) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, সংগীত শিল্পের ৫৮ শতাংশ পেশাদার মনে করেন যে এআই হলো এমন একটি সরঞ্জাম যা মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে দ্রুত বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করে। এটি কোনোভাবেই মানুষের সৃজনশীলতার বিকল্প নয়।
মিউজিক এআই-এর বাজারও অবিশ্বাস্য গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই বাজারের মূল্যমান ছিল ৪.৪৮ বিলিয়ন ডলার। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ এই অংক ৫.৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা এই খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে।
সংগীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এটি প্রতিনিয়ত তার মাধ্যম এবং সরঞ্জাম পরিবর্তন করেছে। কাঠের বাঁশি থেকে সিন্থেসাইজার, কিংবা ম্যাগনেটিক টেপ থেকে ডিজিটাল অডিও ওয়ার্কস্টেশন—প্রতিটি পরিবর্তনই সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। এখন এই বিবর্তনের ধারায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
আগে মেশিনগুলো কেবল শব্দ রেকর্ড করতে পারত, কিন্তু এখন তারা শিল্পীদের সাথে সুর শুনতে এবং বুঝতে শুরু করেছে। আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন আর এটি নয় যে 'এআই কি সুরকারদের জায়গা দখল করবে?', বরং প্রশ্নটি হলো 'মানুষ এবং কোড যখন একসাথে সুর বাঁধবে, তখন পৃথিবীর সুর কতটা বদলে যাবে?' এই নতুন যুগে মানুষ এবং প্রযুক্তির সহাবস্থানই হবে সংগীতের মূল চালিকাশক্তি।
উৎসসমূহ
Economic Times
Music In Africa
Music Business Worldwide
We Rave You
American Songwriter
The Economic Times


