কিংবদন্তি মার্কিন শিল্পী বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড (Barbra Streisand), যিনি বিনোদন জগতের বিরল ‘ইগোট’ (EGOT) মর্যাদার অধিকারী, তাকে ২০২৬ সালের ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানসূচক ‘পাম দ’র’ (Honorary Palme d'Or) প্রদান করা হবে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এবং সংগীতের ভুবনে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি তাকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উৎসব কর্তৃপক্ষ।
আগামী ২৩ মে, ২০২৬ তারিখে পালে দে ফেস্তিভাল এ দে কংগ্রে (Palais des Festivals et des Congrès) ভবনে আয়োজিত উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে এই বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হবে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের প্রিয় এই শিল্পীর জন্য এটি হবে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে আরও একটি পালক যুক্ত করবে।
মজার বিষয় হলো, বিশ্ব চলচ্চিত্র এবং সংগীতের ইতিহাসে বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডের অবদান অপরিসীম হওয়া সত্ত্বেও, এটিই হবে কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার প্রথম উপস্থিতি। দীর্ঘ কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য কালজয়ী কাজ উপহার দিলেও কানের লাল গালিচায় তাকে আগে কখনো দেখা যায়নি, যা এই অনুষ্ঠানটিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের শৈল্পিক পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো (Thierry Frémaux) এই ঘোষণা দিতে গিয়ে বলেন যে, এই বিশেষ পুরস্কারটি এমন একজন শিল্পীকে প্রদান করা হচ্ছে যার সৃজনশীল কাজ কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত:
- শৈল্পিক শক্তি
- একটি স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন কণ্ঠস্বর
- সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রতি নিরন্তর প্রচেষ্টা
উৎসবের সভাপতি আইরিস নবলোচ (Iris Knobloch) জোর দিয়ে বলেন যে, স্ট্রাইস্যান্ড এমন একজন শিল্পী যিনি সংগীত এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সর্বদা তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সত্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। তার প্রতিটি কাজ মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে এবং সত্যের সন্ধানে অনুপ্রাণিত করে।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত স্ট্রাইস্যান্ডের ক্যারিয়ারে রয়েছে বিস্ময়কর সব সাফল্য। তার সংগীত এবং চলচ্চিত্রের এই দীর্ঘ যাত্রায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- ৩৭টি স্টুডিও অ্যালবাম
- ১০টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড
- ২টি অস্কার
তার ক্যারিয়ারের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল ‘এ স্টার ইজ বর্ন’ (A Star Is Born) চলচ্চিত্রের ‘এভারগ্রিন’ (Evergreen) গানের জন্য সেরা মৌলিক গান বিভাগে অস্কার জয়। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি প্রথম নারী সুরকার হিসেবে অস্কার জেতার গৌরব অর্জন করেন, যা তৎকালীন সময়ে ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা।
১৯৮৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ইয়েন্টল’ (Yentl) চলচ্চিত্রটি হলিউডের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রজেক্টে স্ট্রাইস্যান্ড একই সাথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন:
- চিত্রনাট্যকার
- পরিচালক
- প্রযোজক
- প্রধান চরিত্রের অভিনেত্রী
এই অসাধারণ কাজের জন্য তিনি সেরা পরিচালক হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব (Golden Globe) পুরস্কার লাভ করেন। বড় স্টুডিওর চলচ্চিত্রে একজন নারী পরিচালক হিসেবে এই অর্জন ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক এবং এটি পরবর্তী প্রজন্মের নারী নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিউজিল্যান্ডের প্রখ্যাত পরিচালক পিটার জ্যাকসনকেও (Peter Jackson) সম্মানসূচক ‘পাম দ’র’ প্রদান করা হবে। তিনি বিশ্বখ্যাত ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’ (The Lord of the Rings) এবং ‘দ্য হবিট’ (The Hobbit) চলচ্চিত্র সিরিজের নির্মাতা হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
উৎসব আয়োজকদের মতে, আধুনিক চলচ্চিত্রে পিটার জ্যাকসনের প্রযুক্তিগত এবং শৈল্পিক উদ্ভাবন এতটাই গভীর যে, চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীকে ‘পিটার জ্যাকসনের আগে এবং পরে’—এই দুই ভাগে ভাগ করা সম্ভব। তার কাজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছে।
বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডের এই স্বীকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্পের প্রকৃত কণ্ঠস্বর কখনো পুরনো হয় না। দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও একটি গান বা একটি চলচ্চিত্র মানুষের মনে একই রকম আবেদন সৃষ্টি করতে পারে, যদি তাতে থাকে অকৃত্রিম সততা এবং সাহসিকতা।
পরিশেষে বলা যায়, এই ধরনের সম্মাননা কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি সেই সব গল্পের জয়গান গায় যা আমাদের সাধারণ মানবতাকে মনে করিয়ে দেয়। স্ট্রাইস্যান্ডের জীবন ও কর্ম আগামী দিনের শিল্পীদের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।



