ডিজনি এবং পিক্সার অ্যানিমেশন স্টুডিও তাদের ৩০তম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে ‘হপার্স’ (Hoppers) নামক এক রোমাঞ্চকর অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এই বিশেষ প্রজেক্টটি জনসমক্ষে আনা হয়, যা মূলত বন্যপ্রাণীর জীবন এবং পরিবেশগত সংকটের এক অনন্য মেলবন্ধন। ‘উই বেয়ার বিয়ারস’ (We Bare Bears) সিরিজের জনপ্রিয় নির্মাতা ড্যানিয়েল চং এই সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন। পিক্সারের চিরচেনা হাস্যরস এবং উত্তেজনার পাশাপাশি এই ছবিতে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক গভীর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ২০২৬ সালের ৬ মার্চ থেকে এটি প্রদর্শিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সিনেমার মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ১৯ বছর বয়সী এক অদম্য প্রাণিপ্রেমী তরুণী মেবেল তানাকাকে কেন্দ্র করে। মেবেল তার প্রিয় বনভূমিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ‘হপার্স’ নামক একটি অত্যন্ত গোপন ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সে নিজের মানব চেতনাকে একটি রোবটিক বিভারের শরীরে স্থানান্তরিত করতে সক্ষম হয়। তার এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো বিভারটনের নতুন মেয়র জেরি জেনেরা জো-র একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা রুখে দেওয়া। মেয়র সেখানে একটি বিশাল বাইপাস হাইওয়ে নির্মাণ করতে চান, যা তার দাবি অনুযায়ী যাতায়াতের সময় মাত্র চার মিনিট কমিয়ে দেবে। মেবেল এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অনেক আবেদন ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করলেও কোনো ফল পায়নি, যতক্ষণ না সে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবিত এই বিশেষ প্রযুক্তির সন্ধান পায়।
পরিচালক ড্যানিয়েল চং এর আগে পিক্সারের ‘কারস ২’ (২০১১) এবং ‘ইনসাইড আউট’ (২০১৫)-এর মতো কালজয়ী প্রজেক্টগুলোতে স্টোরিবোর্ড শিল্পী হিসেবে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ‘হপার্স’ নির্মাণের জন্য তিনি দীর্ঘ ছয় বছর নিরলস পরিশ্রম করেছেন, যেখানে পিক্সারের বিশাল ঐতিহ্যের চাপ সামলে প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত করার চেষ্টা ছিল। চং এই সিনেমার অনুপ্রেরণা হিসেবে বিভিন্ন পশুপাখি বিষয়ক তথ্যচিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও তিনি ‘অ্যাভাটার’ এবং জনপ্রিয় শর্ট ফিল্ম ‘ওয়ালেস অ্যান্ড গ্রোমিট: দ্য রং ট্রাউজার্স’-এর প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি মূলত একটি ‘আমেরিকান স্পাই থ্রিলার’-এর আদলে এই অ্যানিমেশনটি তৈরি করতে চেয়েছেন। এই চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছেন নিকোল প্যারাডিস গ্রিন্ডল, যিনি এর আগে ‘ইনক্রেডিবলস ২’-এর মতো সফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন।
এই চলচ্চিত্রের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে একঝাঁক প্রতিভাবান তারকা যুক্ত হয়েছেন। প্রধান চরিত্র মেবেলের কণ্ঠে অভিনয় করেছেন পাইপার কার্দা, বিভারদের রাজা জর্জের ভূমিকায় রয়েছেন ববি ময়নিহান এবং খলনায়ক মেয়র জেরির চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন জন হ্যাম। সিনেমাটি কেবল একটি সাধারণ পরিবেশবাদী বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি সহানুভূতি, নৈতিক দায়িত্ব এবং মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছে। এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ বা ক্ষোভ অনেক সময় আধিপত্য বিস্তারের নেশায় পরিণত হতে পারে। উল্লেখ্য যে, সিনেমার প্রাথমিক সংস্করণে পরিবেশগত বার্তাগুলো অনেক বেশি কঠোর ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে দর্শকদের বিনোদন এবং চরিত্রগুলোর মানসিক বিকাশের দিকে নজর দিয়ে তা কিছুটা নমনীয় করা হয়েছে।
যদিও অনেক সমালোচক এটিকে ‘অ্যাভাটার’-এর সাথে তুলনা করছেন, তবে ‘হপার্স’ মূলত ‘মানুষ বনাম প্রকৃতি’র চিরাচরিত সংঘাতের বাইরে গিয়ে এক নতুন গল্প বলে। এটি দেখায় কীভাবে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে এবং সেই সংঘাত নিরসনের জন্য কেবল মৌখিক ক্ষমাই যথেষ্ট নয়, বরং আচরণের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ১০৪ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণে পিক্সার প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সব মিলিয়ে, এটি এমন একটি সিনেমা হতে যাচ্ছে যা সব বয়সের দর্শকদের যেমন আনন্দ দেবে, তেমনি গভীরভাবে ভাবতেও বাধ্য করবে।



