২০২৬ সালে ইতালীয় ব্যানফ (BANFF) মাউন্টেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের চতুর্দশ বিশ্ব সফর তার বর্ণাঢ্য যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এই বিশেষ আয়োজনে দর্শকদের সামনে পাহাড়ের রোমাঞ্চ এবং সক্রিয় জীবনধারা সম্পর্কিত অত্যন্ত যত্নসহকারে বাছাইকৃত চলচ্চিত্রগুলো উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইতালি এবং সুইজারল্যান্ডের ইতালীয় ভাষাভাষী অঞ্চলে আয়োজিত এই ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র উৎসবটি মূলত কানাডায় উদ্ভূত একটি বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বছরের সফরটি ৩ ফেব্রুয়ারি মিলান শহর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং এটি ২০ মার্চ পর্যন্ত চলবে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে উৎসবটি ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের মোট ৪২টি ভিন্ন ভিন্ন জনপদ ও শহরে প্রদর্শিত হবে। মিলানের ঐতিহাসিক তেত্রো কারকানো (Teatro Carcano) থিয়েটারে রাত ৮টায় উদ্বোধনী প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে প্রথম শো-এর সমস্ত টিকিট আগেভাগেই সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
২০২৬ সালের কর্মসূচির মূল ভাবনা আবর্তিত হয়েছে 'লাইন' বা 'রেখা' ধারণাটিকে কেন্দ্র করে, যা কেবল ক্রীড়া সাফল্যকে ছাপিয়ে সচেতন পছন্দ এবং গভীর পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই 'রেখা' হতে পারে একটি আদর্শ পথ যা অতিক্রম করার আগেই মনে মনে এঁকে নেওয়া হয়: যেমন দুর্গম ঢালে স্কি-র দাগ, ভঙ্গুর বরফের পথ অথবা পাথুরে দেয়ালে বেছে নেওয়া কোনো নির্দিষ্ট গতিপথ। এই প্রোগ্রামে ছয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মধ্যম দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা স্কিইং, পর্বতারোহণ এবং খরস্রোতা জলে কায়াকিংয়ের মতো চরম রোমাঞ্চকর খেলাগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছে। এই চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রায়ণ জাপানি দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে মঁ ব্লাঁ (Mont Blanc) পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে করা হয়েছে।
২০১৩ সাল থেকে ইতালিতে নিয়মিতভাবে পরিচালিত এই বিশ্ব সফরটি মূলত কানাডার বিখ্যাত 'ব্যানফ সেন্টার মাউন্টেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল'-এর সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালে এই কানাডিয়ান উৎসবটি তার প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর বা সুবর্ণ জয়ন্তী (১৯৭৬-২০২৬) উদযাপন করছে। বিশ্বজুড়ে পাহাড়, অ্যাডভেঞ্চার এবং আউটডোর স্পোর্টস বিষয়ক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই উৎসবটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইভেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একটি সমমনা মানুষের সম্প্রদায় গড়ে তোলা, যারা প্রাকৃতিক বিশ্বের সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ককে সম্মান করে। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং পরিবেশের পরিবর্তন এবং প্রকৃতির প্রতি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমসাময়িক বিষয়গুলোতে দর্শকদের নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
এই সফরের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্র পরিচালক এবং ক্রীড়াবিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সরাসরি মতবিনিময়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তুরিনে 'গ্যাবন আনচার্টেড' (Gabon Uncharted) চলচ্চিত্রের পরিচালক ডেভিড আরনড (David Arnaud)-এর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এই সফরের ভৌগোলিক পরিধি আল্পস পর্বতমালা থেকে শুরু করে সিসিলি পর্যন্ত ইতালির এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। জেনোয়াতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি 'দ্য স্পেস সিনেমা পোর্তো আন্তিকো'-তে (The Space Cinema Porto Antico) একটি সফল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৯ মার্চ পাভিয়ার 'পলিটেয়ামা' (Politeama) সিনেমা হলে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে পাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-রেক্টর অধ্যাপক ফেদেরিকা ভিলা (Federica Villa) বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
এই উৎসবের পর্দায় প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোতে আইসল্যান্ডের হিমশীতল প্রান্তর, নেপালের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, গ্যাবনের গহীন অরণ্য এবং রকি পর্বতমালার মতো বৈচিত্র্যময় স্থানগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই চিত্রায়ণগুলো কেবল মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বা ক্রীড়া সাফল্যকে তুলে ধরে না, বরং ভূপ্রকৃতিকে পাঠ করার এবং সচেতনভাবে প্রকৃতির বুক চিরে পথ চলার মানবিক ক্ষমতাকেও উদযাপন করে। ৪২টি শহরে বিস্তৃত এই চলচ্চিত্র উৎসবটি বর্তমানে পর্বত ক্রীড়া এবং আউটডোর অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য একটি অপরিহার্য বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রদের সাহসিকতাপূর্ণ গল্পের মাধ্যমে এটি সাধারণ মানুষকে তাদের নিজস্ব স্বপ্ন ও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত করে এবং প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে বাঁচার এক নতুন দিশা প্রদান করে।



