'লাভ স্টোরি: জন এফ. কেনেডি জুনিয়র এবং ক্যারোলিন বেসেট' মিনি-সিরিজের মাধ্যমে আবারও আলোচনায় ক্যারোলিন বেসেট-কেনেডির কালজয়ী ফ্যাশন শৈলী
সম্পাদনা করেছেন: Katerina S.
রায়ান মারফির নতুন মিনি-সিরিজ 'লাভ স্টোরি: জন এফ. কেনেডি জুনিয়র এবং ক্যারোলিন বেসেট' নব্বইয়ের দশকের অন্যতম প্রভাবশালী এবং আলোচিত এই দম্পতির ফ্যাশন ও জীবনধারাকে আবারও বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে এসেছে। ক্যারোলিন বেসেট-কেনেডি তার পেশাদার জীবন শুরু করেছিলেন বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস ক্যালভিন ক্লেইন (Calvin Klein)-এ, যেখানে তিনি নিজের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে মার্কেটিং ডিরেক্টর পদে উন্নীত হন। তার ফ্যাশন শৈলী মূলত মিনিমালিজম বা নূন্যতমতা এবং 'কোয়ায়েট লাক্সারি' বা শান্ত আভিজাত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যা সেই সময়ে ছিল অত্যন্ত আধুনিক। এই বিশেষ নান্দনিকতা আজও সমসাময়িক ডিজাইনারদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা; বিশেষ করে প্রখ্যাত ডিজাইনার রাল্ফ লরেন (Ralph Lauren) তার ডিজাইন টিমকে নতুন সংগ্রহের স্কেচ তৈরির সময় ক্যারোলিনের কালজয়ী লুকগুলো অনুসরণ করার বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
বেসেট-কেনেডির স্টাইলকে প্রায়ই তার শাশুড়ি এবং আমেরিকার সাবেক ফার্স্ট লেডি জ্যাকলিন কেনেডির ফ্যাশন সেন্সের সাথে তুলনা করা হয়। তবে ক্যারোলিনের নিজস্বতা ছিল তার অনাড়ম্বর পছন্দের মধ্যে, যেখানে তিনি অতিরিক্ত অলঙ্করণ বা উজ্জ্বল রঙের পরিবর্তে কালো, সাদা এবং ডেনিমের মতো নিরপেক্ষ রঙের প্যালেট বেছে নিতেন। তার এই পরিচ্ছন্ন এবং মার্জিত উপস্থিতি তাকে কেবল একজন ফ্যাশন আইকন হিসেবেই নয়, বরং রুচিশীলতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
সিরিজটির প্রচারের শুরুর দিকে ফ্যাশন মহলে কিছুটা সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। বিশেষ করে অভিনেত্রী সারা পিজিয়ন যখন ক্যারোলিনের চরিত্রে পর্দায় হাজির হন, তখন অনেক ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ কিছু সূক্ষ্ম অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ব্যাগের পছন্দ। তবে নির্মাতা রায়ান মারফি পরবর্তীতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করেন এবং জানান যে, ক্যারোলিনের অত্যন্ত প্রিয় বারকিন ৪০ (Birkin 40) মডেলের ব্যাগটি চিত্রগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল যাতে সত্যতা বজায় থাকে।
সারা পিজিয়ন কেবল বাহ্যিক সাজপোশাকের ওপর গুরুত্ব দেননি, বরং তিনি ক্যারোলিনের ব্যক্তিত্বের গভীরতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ক্যারোলিনের বুদ্ধিমত্তা এবং সংবাদমাধ্যমের অবিরাম চাপের মুখে তার ধৈর্যশীল আচরণ ছিল প্রশংসনীয়। জন এফ. কেনেডি জুনিয়র ছোটবেলা থেকেই লাইমলাইটে বড় হলেও ক্যারোলিনের জন্য এই অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং। সিরিজের কাহিনী এই দম্পতির প্রেমকাহিনীর বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৯৬ সালে জর্জিয়ার নির্জন কাম্বারল্যান্ড দ্বীপে তাদের অত্যন্ত গোপনীয় বিবাহ অনুষ্ঠান। সেই বিশেষ দিনে ক্যারোলিন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ক্যালভিন ক্লেইনের প্রাক্তন সহকর্মী নার্সিসো রদ্রিগেজের ডিজাইন করা একটি আইকনিক সিল্ক ক্রেপ স্লিপ ড্রেস পরেছিলেন, যা আজও বিয়ের পোশাকের ইতিহাসে এক মাইলফলক।
কনের সেই সাজে ছিল একটি সূক্ষ্ম টুলের ওড়না (tulle veil), স্বচ্ছ লম্বা গ্লাভস এবং ক্রিস্টাল খচিত মানোলো ব্লাহনিক (Manolo Blahnik) সাটিন স্যান্ডেল। সেই সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ এবং ভারী বিয়ের পোশাকের প্রথা ভেঙে এই সাধারণ অথচ অত্যন্ত আধুনিক সাজ এক নতুন ফ্যাশন ধারার জন্ম দিয়েছিল। ক্যারোলিনের চুলের স্টাইল ছিল একটি সাধারণ অগোছালো খোঁপা, যা তিনি জ্যাকলিন কেনেডি ওনাসিসের একটি ব্যক্তিগত ক্লিপ দিয়ে সাজিয়েছিলেন, যা তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি এক বিশেষ সম্মান প্রদর্শন ছিল।
এই মিনি-সিরিজে জন এফ. কেনেডি জুনিয়রের ক্যাজুয়াল এবং 'প্রেপি' স্টাইলকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়েছে। জনের এই ঘরোয়া এবং আরামদায়ক পোশাকের ধরন ক্যারোলিনের পরিশীলিত গাম্ভীর্যের সাথে এক চমৎকার বৈপরীত্য তৈরি করেছিল, যা তাদের সেই যুগের সবচেয়ে স্টাইলিশ দম্পতি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিল। জন, যিনি নিজের ম্যাগাজিন 'জর্জ' (George) সম্পাদনায় ব্যস্ত থাকতেন, তিনি সবসময় চাইতেন তার স্ত্রী যেন এমন কোনো পোশাক না পরেন যা কোনো বিজ্ঞাপনদাতার প্রচার হিসেবে গণ্য হতে পারে। তিনি চেয়েছিলেন তাদের ব্যক্তিগত জীবন যেন বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে।
এই অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রিয় দম্পতির জীবনের এক করুণ ও মর্মান্তিক সমাপ্তি ঘটে ১৯৯৯ সালের ১৬ জুলাই। জন কেনেডি জুনিয়রের ব্যক্তিগত বিমানটি মার্থাস ভিনিয়ার্ড দ্বীপের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় জন, ক্যারোলিন এবং তার বোন লরেন বেসেট প্রাণ হারান, যা সারা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
'আমেরিকান হরর স্টোরি' এবং 'আমেরিকান ক্রাইম স্টোরি'-র মতো বিশ্বখ্যাত প্রজেক্টের সফল নির্মাতা রায়ান মারফির এই নতুন সৃষ্টিটি বর্তমানে এফএক্স (FX) এবং হুলু (Hulu) প্ল্যাটর্মে দর্শকদের জন্য উপলব্ধ। যদিও পোশাক পরিকল্পনা নিয়ে শুরুতে কিছু বিতর্ক ছিল, তবে সমালোচকরা একমত যে সিরিজটি নব্বইয়ের দশকের নিউ ইয়র্কের সেই বিশেষ নস্টালজিক পরিবেশকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এতে তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয় নাইটক্লাব যেমন নেলস (Nell's) এবং টানেল (Tunnel)-এর দৃশ্যগুলো দর্শকদের সেই সোনালী সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
ক্যারোলিন বেসেট-কেনেডির ফ্যাশন শৈলী আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফ্যাশন প্রেমীদের কাছে এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। তার রুচি, ব্যক্তিত্ব এবং নান্দনিকতাবোধ যে সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও আধুনিক ছিল, বর্তমান সময়ে তার স্টাইলের পুনর্জাগরণ সেটিই বারবার প্রমাণ করে। তার রেখে যাওয়া এই ফ্যাশন উত্তরাধিকার আজও সমসাময়িক সংস্কৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
8 দৃশ্য
উৎসসমূহ
O Globo
La Opinion A Coruña - laopinioncoruna.es
El Periódico
Variety
Digital Journal
AV Club
TheWrap
Wikipedia
Observer
Britannica
Television Academy
Time Magazine
Wikipedia
National Today
Town & Country Magazine
Britannica
Vulture
FX Networks
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
