নিউ ইয়র্কের ফ্যাশন মৌসুমে মার্ক জ্যাকবসের 'মেমরি লস' সংগ্রহের রাজকীয় সূচনা
সম্পাদনা করেছেন: Katerina S.
বিখ্যাত ডিজাইনার মার্ক জ্যাকবস ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের ঐতিহাসিক পার্ক অ্যাভিনিউ আর্মারিতে তার ২০২৬ সালের বসন্ত-গ্রীষ্মের সংগ্রহ প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ব ফ্যাশন ক্যালেন্ডারের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই এই সাত দিনের দীর্ঘ ফ্যাশন ম্যারাথনের অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় তার এই জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে। 'মেমরি লস' বা 'স্মৃতিভ্রংশ' শিরোনামের এই সংগ্রহটি মূলত সময়ের নিরন্তর প্রবাহ, সৃজনশীলতার উৎস এবং ব্যক্তিগত অতীতের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান। এটি জ্যাকবসের সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোর সেই পরিচিত অতিশয়োক্তিপূর্ণ এবং অ্যাভান্ট-গার্ড নকশা থেকে এক আমূল পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
জ্যাকবস তার নতুন নকশায় বিশাল আকৃতির সিলুয়েট বা অবয়ব থেকে সরে এসে ১৯৬০-এর দশকের ধ্রুপদী নান্দনিকতা এবং সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। এই প্রদর্শনীর প্রস্তুতি হিসেবে ডিজাইনার নয়টি অত্যন্ত প্রভাবশালী ফ্যাশন সংগ্রহের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন যা তাকে এই সৃজনশীল যাত্রায় অনুপ্রাণিত করেছে। এই তালিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইভ সাঁ লোরোঁর ১৯৬৫ সালের হাউট ক্যুচার, ১৯৯৬ সালের বসন্তের প্রাডা সংগ্রহ, ১৯৯৫ সালের শরতের হেলমুট ল্যাং এবং ১৯৯৪ সালের এক্স-গার্ল সংগ্রহ। এছাড়াও পেরি এলিসের জন্য জ্যাকবসের নিজস্ব আইকনিক ১৯৯৩ সালের বসন্তের গ্রাঞ্জ সংগ্রহটিও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ফ্যাশন ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে পরিচিত।
প্রদর্শনীর মঞ্চসজ্জা বা সীনোগ্রাফি স্মৃতি এবং উপলব্ধির বিকৃতির থিমটিকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আর্মারির বিশাল চত্বরে শিল্পী রবার্ট থেরিয়েনের তৈরি বিশালাকার আসবাবপত্রগুলো এবার 'মানুষের স্বাভাবিক আকারে' নামিয়ে আনা হয়েছিল, যা দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক ধরণের বিভ্রান্তি তৈরি করে। হলের এক কোণে রাখা একটি ছোট টেবিলে আন্না ওয়েয়ান্টের আঁকা 'ডেইজি' নামক একটি ক্ষুদ্র চিত্রকর্ম শোভা পাচ্ছিল। ফ্যাশন সমালোচকদের মতে, এই ক্ষুদ্র শিল্পকর্মটি প্রতীকীভাবে এই বার্তাই বহন করে যে স্মৃতি এবং সৌন্দর্য আসলে জীবনের অতি ক্ষুদ্র এবং ব্যক্তিগত খুঁটিনাটির মধ্যেই নিহিত থাকে।
এই সংগ্রহের রঙের বিন্যাসে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে কোমল গোলাপি ও আকাশী নীল রঙের সাথে গম্ভীর ধূসর ও কালো রঙের এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে। রানওয়েতে নব্বইয়ের দশকের ফ্যাশন কোডগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল, যার মধ্যে ছিল শরীরের সাথে মিশে থাকা সিলুয়েট, ভি-নেক নিটেড সোয়েটার এবং একদম সোজা কাটের স্কার্ট। তবে পোশাকের আনুপাতিক গঠনে ডিজাইনার অত্যন্ত সচেতনভাবে কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন; যেমন স্কার্টের কোমর কিছুটা ঢিলেঢালা রাখা হয়েছিল এবং কিছু কোট এমনভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল যা উল্টোভাবে পরা, অর্থাৎ বোতামগুলো পিঠের দিকে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ছিল। পুরো আয়োজনটির আবহ সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়েছিল আইসল্যান্ডীয় গায়িকা বিয়র্কের বিখ্যাত গান 'জোগা' (Jóga), যা পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল।
এই বিশেষ প্রদর্শনীতে এলভিএমএইচ (LVMH) এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরব উপস্থিতি মার্ক জ্যাকবস ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে আরও দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই ফ্যাশন হাউসটি নতুন ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, তবে এই সফল প্রদর্শনী সেই জল্পনাকে অনেকাংশেই স্তিমিত করে দিয়েছে। জ্যাকবসের এই নতুন সংগ্রহটি প্রমাণ করেছে যে তিনি এমন পরিধানযোগ্য এবং আধুনিক পোশাক তৈরি করতে পারদর্শী যা কেবল ফ্যাশন নয়, বরং বর্তমান জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষের মনে এক ধরণের ইতিবাচক আশার আলো সঞ্চার করে। এটি ছিল স্মৃতি হারানোর বেদনার মাঝেও নতুন করে পথ খুঁজে পাওয়ার এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Revista Marie Claire Brasil
ELLE
Hypebae
dscene magazine
FashionNetwork
S Moda | EL PAÍS
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।