সূর্য কি শান্ত হচ্ছে? ২০২৬ সালে সৌর কার্যকলাপে অভাবনীয় মন্দা

লেখক: Uliana Soloveva

সূর্য ডিস্কে কয়েকটি সানস্পটের গ্রুপ ধরা পড়েছে, তবে কেবল কম সৌর ক্রিয়াশীলতা প্রত্যাশিত।

সূর্য তার রহস্যময় আচরণের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বারবার বিস্মিত করে চলেছে। প্রতি ১১ বছর অন্তর সূর্য একটি নির্দিষ্ট চক্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, যেখানে সৌর কলঙ্ক বা সানস্পটের উত্থান-পতন ঘটে। এই কালো দাগগুলো সূর্যের 'মেজাজ' বা সক্রিয়তার প্রধান সূচক হিসেবে কাজ করে। সূর্যের বায়ুমণ্ডলে চৌম্বকীয় ঝড়ের ফলে সৃষ্ট এই দাগগুলো মহাকাশের আবহাওয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করে, যার ফলে মেরুজ্যোতি থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিঘ্ন এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। বর্তমানে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সূর্যের এই অপ্রত্যাশিত শান্ত রূপ বিজ্ঞানীদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

এই বছরের শুরুর মাসগুলো থেকেই পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। ১৭৪৯ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল সোলার ডেটা সেন্টার (SIDC) যে মানদণ্ডে সৌর কলঙ্ক পরিমাপ করে আসছে, সেই অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ৭৮.২-এ। এটি ২০২২ সালের আগস্ট মাসের (৭৪.৬) পর সর্বনিম্ন রেকর্ড। অথচ ২০২৪ সালের আগস্টে এই সক্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছেছিল, যখন সৌর কলঙ্কের সংখ্যা ছিল ২১৬—যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া ২৫তম সৌর চক্রটি মাঝারি হবে বলে ধারণা করা হলেও, এটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোর গতিপ্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এনওএএ (NOAA) স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের পূর্বাভাস অনুযায়ী সৌর সক্রিয়তা যতটা কমার কথা ছিল, বাস্তবে তা অনেক দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তাদের গাণিতিক মডেলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জন্য ১১৪.৮ এবং মার্চের জন্য ১১৫.০ মান নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৬ সালের মার্চের প্রথম ১০ দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, সৌর কলঙ্কের গড় সংখ্যা মাত্র ৮২-তে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারির নিম্নমুখী প্রবণতাকেই অব্যাহত রেখেছে। নাসার সোলার ডায়নামিক্স অবজারভেটরি (SDO) থেকে প্রাপ্ত প্রতিদিনের ছবিগুলো এই নিস্তব্ধতার প্রমাণ দিচ্ছে। সেখানে সৌর শিখার (flares) উপস্থিতি খুবই নগণ্য এবং পৃষ্ঠতলের সক্রিয় প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির অভাব স্পষ্ট। সূর্য যেন এক দীর্ঘ বিরতি নিয়েছে, যেখানে কেবল মাঝে মাঝে দুর্বল কিছু স্পন্দন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ইতিহাসে এমন ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের মে মাসেও সৌর চক্রটি হঠাৎ করে ৭৮.৫-এ নেমে এসেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুত তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানের এই মন্দাকে একটি সাময়িক বিচ্যুতি বা 'ফ্লাকচুয়েশন' হিসেবেই দেখছেন। এনওএএ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের আগে সৌর কলঙ্কের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে ৮০-র নিচে নামার কথা নয়। তবে মার্চের শুরুতেই গড় মান ৭৪.৮-এ নেমে আসা বিজ্ঞানীদের মডেল পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করতে পারে। ২০২৬ সালের ৯ মার্চের সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে এনওএএ জানিয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে সৌর সক্রিয়তা কম থাকবে এবং শক্তিশালী শিখার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

২০২৬ সালের ৪ মার্চ নাসার হালনাগাদকৃত দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে বলা হয়েছে যে, ২০৩০ সাল নাগাদ সূর্য তার সর্বনিম্ন সক্রিয়তায় পৌঁছাবে। তবে এই যাত্রাপথে সৌর সক্রিয়তার মাত্রায় বিভিন্ন ধরনের চড়াই-উতরাই দেখা দিতে পারে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন গবেষণার খোরাক জোগাবে।

পৃথিবীর জন্য সূর্যের এই শান্ত ভাব বেশ কিছু ব্যবহারিক গুরুত্ব বহন করে। সৌর কলঙ্ক কম থাকার অর্থ হলো সৌর বায়ুর প্রভাব কমে যাওয়া এবং ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের আশঙ্কা হ্রাস পাওয়া, যা স্যাটেলাইট এবং বিমান চলাচলের জন্য নিরাপদ। অন্যদিকে, যারা মেরুজ্যোতি বা অরোরা দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি কিছুটা হতাশাজনক হতে পারে। কারণ শক্তিশালী করোনাল মাস ইজেকশন ছাড়া এই দৃশ্য বিরল হয়ে পড়বে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন; ২০২৬ সালের মার্চ মাসটিই নির্ধারণ করে দেবে এটি কি কেবল সাময়িক বিশ্রাম নাকি সৌর চক্রের দ্রুত সমাপ্তির সংকেত।

2 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।