আজ, ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে, বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মহলে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সিএসআইআরও (CSIRO) এবং বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার' (Nature)-এর মতো নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানীদের এক অভাবনীয় সাফল্যের খবর প্রচার করেছে। ডঃ জেমস কোয়াচের সুদক্ষ নেতৃত্বে একদল গবেষক বিশ্বের প্রথম কার্যকরী কোয়ান্টাম ব্যাটারির প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই উদ্ভাবনী যন্ত্রটি চার্জ গ্রহণ, শক্তি ধরে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সরবরাহ করার পূর্ণ চক্র সফলভাবে সম্পন্ন করে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি হলো এর চার্জিং গতি, যা বর্তমান বিশ্বের যেকোনো জ্বালানি ব্যবস্থার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। গবেষকদের মতে, এই কোয়ান্টাম ব্যাটারি ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক গাড়ি মাত্র ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে সম্পূর্ণ চার্জ করা সম্ভব হবে। বর্তমান সময়ে একটি পেট্রোল চালিত গাড়িতে জ্বালানি ভরতে যে সময় লাগে, কোয়ান্টাম ব্যাটারি তার চেয়েও দ্রুত গতিতে কাজ করবে। এটি কেবল সময়ই বাঁচাবে না, বরং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সাথে এই নতুন কোয়ান্টাম ব্যাটারির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেখানে সাধারণ ব্যাটারিগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং আয়নের চলাচলের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে, সেখানে কোয়ান্টাম ব্যাটারি পদার্থবিজ্ঞানের জটিল নীতিগুলো ব্যবহার করে। এটি মূলত কোয়ান্টাম সুপারপজিশন এবং কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এই উন্নত পদ্ধতিটি ব্যাটারির ভেতরে শক্তির ঘনত্ব এবং কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা রসায়ন-নির্ভর ব্যাটারির পক্ষে অসম্ভব।
এই প্রোটোটাইপটির গঠনশৈলীও বেশ আধুনিক। এটি একটি অর্গানিক মাইক্রোক্যাভিটি হিসেবে নকশা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ তারহীন বা ওয়্যারলেস পদ্ধতিতে চার্জ গ্রহণ করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় অতি দ্রুতগতির লেজার পালস ব্যবহার করা হয়। লেজারের ফোটন কণাগুলো ব্যাটারির ভেতরের অণুগুলোকে প্রায় চোখের পলকেই উত্তেজিত অবস্থায় নিয়ে যায়। এর ফলে চার্জিং প্রক্রিয়াটি কোনো যান্ত্রিক বাধা ছাড়াই প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়, যা প্রথাগত চার্জিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে।
এই গবেষণার সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার হলো 'সুপারঅ্যাবজরপশন' বা অতি-শোষণ ক্ষমতা। সাধারণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে আমরা জানি যে, ব্যাটারির আকার যত বড় হয়, সেটি চার্জ হতে তত বেশি সময় নেয়। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত নিয়মে এখানে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে। কোয়ান্টাম ব্যাটারির আকার বা এর ভেতরের কোষের সংখ্যা যত বাড়বে, এর চার্জিং গতি তত বৃদ্ধি পাবে। এটি একটি সম্মিলিত কোয়ান্টাম প্রভাবের ফল, যেখানে ব্যাটারির প্রতিটি কোষ আলাদাভাবে কাজ না করে একটি একক শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে কাজ করে।
গতির কথা বলতে গেলে, এই প্রোটোটাইপটির চার্জিং সময় পরিমাপ করা হয়েছে ফেমটোসেকেন্ডের এককে। উল্লেখ্য যে, এক ফেমটোসেকেন্ড হলো এক সেকেন্ডের এক কোয়াড্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ। যদিও বর্তমানে এই ব্যাটারিটি মাত্র মাইক্রোসেকেন্ড সময়ের জন্য চার্জ ধরে রাখতে সক্ষম, তবুও এটি পূর্ববর্তী সকল রেকর্ডের তুলনায় লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি কার্যকর। ডঃ জেমস কোয়াচ এবং তার দল বিশ্বাস করেন যে, এই প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে এবং খুব শীঘ্রই আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করব যেখানে শক্তি সঞ্চয় হবে মুহূর্তের ব্যাপার।




