স্প্যানিশ জ্যোতির্পদার্থবিদদের নতুন গবেষণা: বামন ছায়াপথের মহাজাগতিক গ্রাস এবং ডার্ক ম্যাটার মডেলের নতুন দিগন্ত

সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.

আকাশগঙ্গাগুলো বিচ্ছিন্ন সিস্টেম নয়, বরং বহুবার সংহত হওয়ার মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এমন সিস্টেম, একটি প্রক্রিয়া যা প্রায়ই মহাজাগতিক বা গ্যাল্যাকটিক 'ক্যানিবালিজম' হিসেবে বর্ণনা করা হয়.

স্পেনের জ্যোতির্পদার্থবিদরা একটি মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে এই তথ্যের পরিমাণগত নিশ্চিতকরণ প্রদান করেছেন যে, বামন ছায়াপথগুলো নিয়মিতভাবে তাদের চেয়েও ছোট উপগ্রহ ছায়াপথগুলোকে গ্রাস করে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে 'মহাজাগতিক নরমাংসভক্ষণ' বা 'কসমিক ক্যানিবালিজম' হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রখ্যাত 'অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স' (A&A) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি প্রথমবারের মতো বামন ছায়াপথগুলোর মধ্যে এই ধরনের একীভূত হওয়ার ঘটনার একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত মূল্যায়ন তুলে ধরেছে। এই গবেষণাটি মহাবিশ্বের ল্যাম্বডা-সিডিএম (Lambda-CDM) নামক আদর্শ কসমোলজিক্যাল মডেল দ্বারা অনুমিত কাঠামোগত গঠনের প্রক্রিয়া বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

এই গবেষণার মূল তথ্যগুলো 'স্টেলার স্ট্রিম লেগাসি সার্ভে' (SSLS) নামক একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে, যা মূলত 'লেগাসি ইমেজিং সার্ভে'-র গভীর চিত্রগুলো ব্যবহার করে সম্পন্ন হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন আন্দালুসিয়া ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (IAA-CSIC) ইয়োআন্না ডি. সাকোভস্কা। উল্লেখ্য যে, এই প্রতিষ্ঠানটি 'সেভেরো ওচোয়া সেন্টার অফ এক্সিলেন্স' হিসেবে বিশেষভাবে স্বীকৃত। গবেষণায় সহ-লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন আরাগন সেন্টার ফর ফিজিক্স অফ কসমস (CEFCA)-এর গবেষক ডেভিড মার্টিনেজ ডেলগাডো, যিনি ২০০৮ সাল থেকে হাভালামব্রে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অবজারভেটরি (OAJ) পরিচালনার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

গবেষকরা প্রায় ৩,১০০টি নিকটবর্তী ছায়াপথের ওপর একটি পদ্ধতিগত সমীক্ষা চালিয়েছেন, যার রেডশিফট সীমা ছিল z~০.০২। এই সমীক্ষায় আকাশগঙ্গা বা মিল্কি ওয়ের মতো প্রায় ৯৪০টি ছায়াপথ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গবেষকরা বামন ছায়াপথগুলোর চারপাশে ১৭টি ক্ষেত্রে মহাজাগতিক বস্তু সংগ্রহের লক্ষণ বা 'অ্যাক্রিশন ফিচার' শনাক্ত করেছেন। এই লক্ষণগুলোর মধ্যে ছিল নাক্ষত্রিক ধারা বা স্টেলার স্ট্রিম, শেল বা খোলস এবং অনিয়মিত নাক্ষত্রিক হ্যালো। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ১১টি সিস্টেমে খোলস এবং ৮টি সিস্টেমে অসম নাক্ষত্রিক হ্যালো শনাক্ত করা হয়েছে, যার সাথে একটি সুস্পষ্ট নাক্ষত্রিক ধারাও বিদ্যমান ছিল। বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ক্ষুদ্রতম ছায়াপথগুলোর মধ্যেও এই 'ক্যানিবালিজম' একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা, যা বিদ্যমান তাত্ত্বিক মডেলগুলোর সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ক্ষুদ্র পরিসরে ছায়াপথগুলোর এই একীভূত হওয়ার হার সফলভাবে নির্ধারণ করা কসমোলজিক্যাল সিমুলেশন বা মহাজাগতিক সিমুলেশনগুলো নির্ভুল করার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ছায়াপথ গঠনের প্রথাগত তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী, ছোট উপগ্রহ ছায়াপথগুলোকে গ্রাস করার মাধ্যমেই ছায়াপথগুলো আকারে বৃদ্ধি পায়। বিশাল ছায়াপথগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট দেখা গেলেও, বামন ছায়াপথগুলোর ক্ষেত্রে এর ক্ষীণ চিহ্নগুলো খুঁজে পাওয়া দীর্ঘকাল ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে SSLS প্রকল্পটি r-ব্যান্ডে প্রতি বর্গ আর্কসেকেন্ডে প্রায় ২৯ ম্যাগনিটিউড পর্যন্ত উজ্জ্বলতা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যা এই অসাধ্য সাধনে এবং মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে বিশেষ সহায়তা করেছে।

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তুর প্রকৃতি উন্মোচন করার সম্ভাবনা। বামন ছায়াপথগুলোতে এই রহস্যময় বস্তুর প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি থাকে এবং নাক্ষত্রিক ধারা বা স্টেলার স্ট্রিমের গঠন ডার্ক ম্যাটার হ্যালোর মহাকর্ষীয় বিভবের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একটি নির্দিষ্ট নাক্ষত্রিক ধারার গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এটি নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক মডেলের সাথে মিলে যায়। এর ফলে ডার্ক ম্যাটার সংক্রান্ত গবেষণাকে কেবল গাণিতিক মডেলিং থেকে সরিয়ে দৃশ্যমান কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে ২০২৬ সালে এলএসএসটি (LSST) টেলিস্কোপের মতো নতুন যন্ত্রপাতির সাহায্যে আরও ক্ষীণ সংকেত শনাক্ত করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ল্যাম্বডা-সিডিএম মডেলের অধীনে মহাবিশ্বের ক্রমিক বিকাশকে আরও দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করবে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • okdiario.com

  • Infobae

  • Instituto de Astrofísica de Andalucía - IAA-CSIC

  • Diario de Teruel

  • ONDA Aragonesa

  • Instituto de Astrofísica de Canarias • IAC

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।