গভীর মহাকাশে ঘটে যাওয়া রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো অনুকরণ করে কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Colorado Boulder) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল যুগান্তকারী পরীক্ষাগার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটিতে (Journal of the American Chemical Society) প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলগুলি ফুলারিন, যেমন বাকমিনস্টারফুলারিন (C60), যা আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান, সেগুলোর গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করে। মূল অনুমানটি হলো—মহাজাগতিক বিকিরণ একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, যা পলিকাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনস (পিএএইচ) নামক যৌগগুলিকে এই গোলাকার কার্বন অণুতে রূপান্তরিত করে।
এই রূপান্তরকে মহাবিশ্বের রাসায়নিক বিবর্তনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এটি জটিল জৈব যৌগগুলির উৎপাদনে সহায়তা করে, যা পরবর্তীকালে নক্ষত্র এবং গ্রহ ব্যবস্থার গঠনের জন্য অপরিহার্য। মহাজাগতিক পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করার জন্য গবেষকরা দুটি ছোট পিএএইচ অণু—অ্যানথ্রাসিন (anthracene) এবং ফেনানথ্রিনকে (phenanthrene) ইলেকট্রন রশ্মি দিয়ে আঘাত করেন। এই প্রক্রিয়াটি হাইড্রোজেন পরমাণুগুলিকে অপসারণ করে এবং একটি মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটায়, যার ফলে কার্বন পরমাণুগুলি ষড়ভুজাকার (hexagonal) এবং পঞ্চভুজাকার (pentagonal) বিন্যাস তৈরি করতে শুরু করে।
এই পরীক্ষাগার মডেলিংয়ের একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে পঞ্চভুজযুক্ত অণুগুলিই সেই অনুপস্থিত সংযোগ হতে পারে, যা পিএএইচ থেকে স্থিতিশীল ফুলারিনে রূপান্তরের পথ সুগম করে। এই আবিষ্কার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি মহাকাশে ফুলারিন গঠনের একটি সম্ভাব্য এবং সম্ভবত বহুল প্রচলিত প্রক্রিয়া তুলে ধরে। এই পদ্ধতিতে গঠিত ফুলারিনগুলি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (James Webb Space Telescope) সহ আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে শনাক্ত করা যেতে পারে।
এই জটিল অণুগুলির সনাক্তকরণ বিজ্ঞান সমাজকে নক্ষত্র এবং সমগ্র গ্রহ ব্যবস্থার গঠনের মূলে থাকা রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। গবেষণাটি পূর্বের উচ্চ-শক্তির প্রক্রিয়া, যেমন সুপারনোভা বিস্ফোরণের উপর জোর দেওয়া ধারণা থেকে সরে এসে মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাবে ধীরগতির প্রক্রিয়াটির দিকে মনোযোগ স্থানান্তরিত করেছে। এইভাবে, এই নতুন পথটি বোঝার মাধ্যমে কেবল মহাকাশে C60-এর ব্যাপক উপস্থিতিই ব্যাখ্যা করা যায় না, বরং কীভাবে সরল উপাদানগুলি থেকে মহাবিশ্বে জীবনের উৎপত্তির ভিত্তি তৈরি হয়, সে সম্পর্কেও আমাদের ধারণা প্রসারিত হয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, এই গবেষণাটি মহাজাগতিক রসায়নের একটি মৌলিক ধাঁধার সমাধান করেছে। এটি প্রমাণ করে যে পিএএইচ, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ জৈব অণুগুলির মধ্যে অন্যতম, তা মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাবে সহজেই ফুলারিনের মতো জটিল কাঠামোতে রূপান্তরিত হতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি মহাজাগতিক ধূলিকণা এবং গ্যাস মেঘের মধ্যে ক্রমাগত চলতে থাকে, যা মহাবিশ্বের জৈব উপাদানগুলির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে এবং জীবনের সম্ভাব্য বীজ বপনের পথ তৈরি করে।
