নরওয়ের ট্রোমসো শহরের পশ্চিমে সুমেরু বৃত্তের ভেতরে অবস্থিত নির্জন দ্বীপ সোম্মারয়। এখানে সময়কে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নয়, বরং একটি সাধারণ পরামর্শ হিসেবে দেখা হয়। মাত্র ৩৫০ জন বাসিন্দার এই ছোট্ট জনপদটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে তাদের অনন্য 'সময়মুক্ত অঞ্চল' বা 'টাইম-ফ্রি জোন' ধারণার জন্য। যদিও নরওয়ের রাষ্ট্রীয় আইনে কোনো পরিবর্তন আসেনি, তবে দ্বীপবাসীরা তাদের জীবনযাত্রাকে এমন এক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন যা ঘড়ির কাঁটার প্রথাগত সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
২০১৯ সালের মে থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই সময় বাতিলের আন্দোলনটি বেশ জোরালো হয়ে ওঠে। সুমেরু অঞ্চলের এই জনপদে বছরের কয়েকমাস সূর্য হয় ডোবে না, অথবা ওঠেই না। কৃত্রিম সময়সূচীর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এখানকার বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা কিয়েল ওভে হেভেডিং-এর নেতৃত্বে তারা একটি গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেন এবং ওসলোতে নরওয়েজীয় পার্লামেন্টে তা জমা দেন। তাদের দাবি ছিল বৈপ্লবিক: সোম্মারয়কে বিশ্বের প্রথম সময়মুক্ত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে স্কুল, অফিস এবং ক্যাফেগুলো ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তে প্রাকৃতিক জৈবিক ছন্দের ভিত্তিতে চলতে পারে।
এই সাহসী উদ্যোগটি দ্রুত দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কাড়ে। সাংবাদিকরা অবাক হয়ে বর্ণনা করেছিলেন এমন এক জায়গার কথা, যেখানে ভোর চারটায় ঘাস কাটা বা রাত দুইটায় সমুদ্রসৈকতে বসে কফি খাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এই ব্যাপক প্রচারণার ফলে পর্যটন শিল্পে এক বিশাল জোয়ার আসে। মধ্যরাতের সূর্যের এই বিস্ময়কর ঘটনা নিজের চোখে দেখতে এবং যান্ত্রিক সময়ের চাপ থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এই দ্বীপে ভিড় জমাতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে জানা যায় যে, এই সাড়া জাগানো আবেদনটি ছিল 'ভিজিট নরওয়ে' এবং 'ইনোভেশন নরওয়ে'-এর সহায়তায় পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত বিপণন কৌশলের অংশ। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো আইনি পরিবর্তন না হলেও, বাসিন্দাদের এই নমনীয় জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক এবং তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা। নরওয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে 'সময় বাতিল' অনুমোদন না করলেও এই চর্চায় কোনো বাধাও দেয়নি। ফলে 'টাইম-ফ্রি জোন' ব্র্যান্ডটি দ্বীপের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভূদৃশ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের বর্তমান সময়েও সোম্মারয় তার এই বিশেষ ভাবমূর্তি ধরে রেখেছে। স্থানীয় হোটেল এবং দ্বীপের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটগুলো পর্যটকদের এমন এক 'সময়হীন অঞ্চলে' আসার আমন্ত্রণ জানায় যেখানে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। বিশেষ করে ১৮ মে থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, যখন এখানে মেরু দিবস চলে। এই ৬৯ থেকে ৭০ দিন সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না, যার ফলে পুরো এলাকাটি নিরবচ্ছিন্ন আলোয় প্লাবিত থাকে। এই সময়ে ঘুমানোর প্রথাগত নিয়ম বা সকালের অ্যালার্ম ঘড়ি পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অনন্ত দিবালোকের এই মাসগুলোতে জীবনের গতি নির্ধারিত হয় মানুষের শারীরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে, ঘড়ির কাঁটার সংখ্যায় নয়। এখানে রাত তিনটায় মাছ ধরা, হাঁটতে বের হওয়া বা সমুদ্রসৈকতে বারবিকিউ করা কোনো অবাক করার মতো বিষয় নয়। এমনকি মধ্যরাতের সূর্যের আলোয় ফুটবল ম্যাচও আয়োজন করা হয়, কারণ এই সম্প্রদায়টি মেজাজ অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বীপে মেরু রাত নেমে আসে, যখন আলোর একমাত্র উৎস থাকে অরোরা বোরিয়ালিস বা মেরুজ্যোতি এবং রাস্তার দু-একটি ল্যাম্পপোস্ট।
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জৈবিক ঘড়ির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করলে মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। এই নিবিড়ভাবে সংযুক্ত সম্প্রদায়ে, যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, সেখানে কঠোর সময়সূচীর পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বোঝাপড়াই প্রধান। যদিও দোকানপাট এবং ক্যাফেগুলো একটি আনুমানিক সময় মেনে চলে, তবে গ্রীষ্মের মৌসুমে তারা সর্বোচ্চ নমনীয়তা প্রদর্শন করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পদ্ধতিটি বাসিন্দাদের সুমেরু অঞ্চলের চরম আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে এবং উদ্বেগমুক্ত থাকতে সহায়তা করে।
পর্যটকদের জন্য সোম্মারয় ডিজিটাল নোটিফিকেশন এবং প্রতিনিয়ত ছুটে চলার ব্যস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক বিরল সুযোগ করে দেয়। যদিও 'সময়মুক্ত অঞ্চল' হিসেবে এর কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই, তবুও দ্বীপটি প্রকৃতির সাথে মানুষের সখ্যতার এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। উৎপাদনশীলতার নেশায় মত্ত এই পৃথিবীতে সোম্মারয় এমন এক জায়গা, যেখানে রাত একটার উজ্জ্বল আকাশের নিচে কেউ আপনাকে 'কয়টা বাজে?' তা জিজ্ঞাসা করবে না, বরং এক কাপ সুগন্ধি চায়ের আমন্ত্রণ জানাবে।




