ট্রপিক্যাল সাইক্লোন 'নারেল'-এর প্রভাবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার আকাশ রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করেছে

সম্পাদনা করেছেন: Uliana Soloveva

২০২৬ সালের ২৭ মার্চ, শুক্রবার, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার অঞ্চলগুলো এক অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়কর বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনার সাক্ষী হয়। ট্রপিক্যাল সাইক্লোন 'নারেল' (Narelle) উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে আকাশ এক গাঢ় রক্তিম লাল রঙে ছেয়ে যায়। ডেনহ্যামের শার্ক বে ক্যারাভান পার্ক এলাকা থেকে এই দৃশ্যটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এক অশুভ আভার মতো মনে হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, এই অদ্ভুত রঙের কারণ বৃষ্টি ছিল না, বরং ঝোড়ো বাতাসের কারণে বায়ুমণ্ডলে উড়ে আসা বিশাল ধূলিকণা। পর্যবেক্ষণের শুরুতে ওই নির্দিষ্ট স্থানে বাতাসের গতিবেগ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও আকাশের এই পরিবর্তন সবাইকে চমকে দিয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার পেছনে 'মি-স্ক্যাটারিং' (Mie scattering) নামক একটি প্রক্রিয়াকে দায়ী করেছেন। বায়ুমণ্ডলে ভাসমান আয়রন অক্সাইড সমৃদ্ধ ধূলিকণাগুলো সূর্যের নীল এবং বেগুনি রঙের স্বল্প-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বিচ্ছুরিত করে দেয়, যার ফলে কেবল লাল এবং কমলা রঙের দীর্ঘ-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আমাদের চোখে পৌঁছায়। এই ধূলিকণাগুলো মূলত ডেনহ্যাম থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পিলবারা অঞ্চল থেকে উড়ে এসেছিল। পিলবারা অঞ্চলটি অস্ট্রেলিয়ার লৌহ আকরিক শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ২৮ মার্চ, শনিবার নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়লে আকাশ আবার স্বাভাবিক রঙে ফিরে আসে, যদিও ধুলোর আস্তরণ পরিষ্কার করার কাজ অব্যাহত ছিল।

ট্রপিক্যাল সাইক্লোন 'নারেল' তার গতিপথের কারণে আবহাওয়াবিদদের কাছে একটি ব্যতিক্রমী ঝড় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই প্রথম ঘূর্ণিঝড় যা অস্ট্রেলিয়ার তিনটি ভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। ২০ মার্চ কুইন্সল্যান্ডে ৪-র্থ ক্যাটাগরির ঝড় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়, এরপর ২১ মার্চ এটি নর্দার্ন টেরিটরিতে প্রবেশ করে এবং অবশেষে ২৭ মার্চ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে পৌঁছায়। কোরাল বে-র দক্ষিণে এটি ৩-য় ক্যাটাগরির ঝড় হিসেবে ১৯৫ কিমি/ঘণ্টা বেগে আছড়ে পড়ে। এর আগে ১৯ মার্চ ধারণা করা হয়েছিল যে এটি ৫-ম ক্যাটাগরির রূপ নিতে পারে এবং বাতাসের গতিবেগ ২৫০ কিমি/ঘণ্টা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর আগে ২০০৫ সালে 'ইনগ্রিড' এবং ২০০০ সালে 'স্টিভ' নামক ঘূর্ণিঝড়গুলো এমন বিরল বহু-রাজ্যীয় গতিপথ প্রদর্শন করেছিল।

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ঝোড়ো বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ২৫০ কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছানোর ফলে ঘরবাড়ির ছাদ উড়ে গেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, বিশেষ করে এক্সমাউথ (Exmouth) শহরটি সম্পূর্ণ পানিশূন্য হয়ে পড়ে। জরুরি পরিষেবা এবং কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ব্যস্ত থাকলেও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ধূলিঝড়ের প্রভাব অবকাঠামো এবং দৃশ্যমানতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই ধূলিঝড়টি ওই অঞ্চলের ল্যান্ডস্কেপকে এক অনন্য এবং ভুতুড়ে রূপ দান করেছিল যা দীর্ঘকাল মানুষের মনে গেঁথে থাকবে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ একদিকে যেমন ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, অন্যদিকে বিজ্ঞানের এক চমৎকার দিক উন্মোচন করেছে। পিলবারার লাল মাটি যখন আকাশের নীলিমাকে ঢেকে দেয়, তখন তা জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা এবং এর বহুমুখী প্রভাবকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। উদ্ধারকারী দলগুলো বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এই ঘটনাটি আবহাওয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিরল এবং স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Internewscast Journal

  • GKToday

  • NASA Science

  • Jamaica Observer

  • Open Magazine

  • Bluewin

এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।