বাতাস পরিশোধন ব্যবস্থার জন্য আর্নিকা নির্যাস ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে সিলভার ন্যানো পার্টিকেল সংশ্লেষণ

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ সান কার্লোস (UFSCar) এবং ইউনিভার্সিটি অফ সান পাওলোর (USP) একদল দক্ষ গবেষক সিলভার ন্যানো পার্টিকেল (AgNPs) তৈরির একটি অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব এবং দায়িত্বশীল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এই যুগান্তকারী পদ্ধতির মূল চাবিকাঠি হলো প্রাকৃতিক বিজারক হিসেবে ব্রাজিলিয়ান আর্নিকা উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করা, যা আধুনিক সবুজ ন্যানো প্রযুক্তির বিবর্তনে এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। গবেষকদের এই প্রচেষ্টা মূলত রাসায়নিক বর্জ্য কমিয়ে ন্যানো প্রযুক্তির উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিটি 'সবুজ সংশ্লেষণ' বা গ্রিন সিন্থেসিস হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যা মূলত এই শক্তিশালী অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এজেন্টগুলো তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক বিকারক এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর দ্রাবকগুলোর প্রয়োজনীয়তা দূর করে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বহুগুণ হ্রাস পায়। এই নতুন পদ্ধতির ওপর ইতিমধ্যে একটি পেটেন্ট আবেদন করা হয়েছে এবং বর্তমানে এটি গবেষণাগার থেকে ব্যবহারিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। বিশেষ করে অত্যাধুনিক বাতাস পরিশোধন ব্যবস্থার মানোন্নয়নে এটি বড় ভূমিকা রাখবে, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতাল ও সংবেদনশীল স্থানগুলোর স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করবে।

সিলভার ন্যানো পার্টিকেলগুলো তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী জীবাণুনাশক ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল গুণের জন্য বিজ্ঞান মহলে অনেক আগে থেকেই স্বীকৃত। বর্তমানে বিশ্বে বার্ষিক প্রায় ৫০০ টন এই ন্যানো পদার্থ উৎপাদিত হচ্ছে এবং শিল্প খাতে এর চাহিদাও ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এই গবেষণার মূল দিকটি হলো আর্নিকা উদ্ভিদের সহজাত বিজারণ ক্ষমতাকে কাজে লাগানো। আর্নিকা উদ্ভিদ মূলত তার শক্তিশালী প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ চিকিৎসায় সমাদৃত। প্রধানত উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের পার্বত্য অঞ্চলে আর্নিকা মন্টানা (Arnica montana) জন্মে থাকে, যাতে থাকা বিশেষ ল্যাকটোন প্রদাহের অন্যতম মূল ফ্যাক্টর NF-kB কে বাধা প্রদান করে বলে মনে করা হয়।

বর্তমানে ন্যানো পার্টিকেল তৈরির ক্ষেত্রে উদ্ভিদের নির্যাসের ব্যবহার 'সবুজ রসায়ন' বা গ্রিন কেমিস্ট্রির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর লক্ষ্য হলো চিরাচরিত রাসায়নিক সংশ্লেষণ পদ্ধতির ক্ষতিকারক দিকগুলো সংশোধন করা, যে পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে পরিবেশ-অবান্ধব রাসায়নিক ব্যবহার করা হতো। প্রচলিত রাসায়নিক সংশ্লেষণে প্রায়শই সোডিয়াম বোরোহাইড্রাইড বা সাইট্রেটের মতো কড়া রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। তবে এই সবুজ সংশ্লেষণ পদ্ধতিতে উদ্ভিদে প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান ফ্লেভোনয়েড, পলিফেনল এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো জৈব সক্রিয় উপাদানগুলো সিলভার আয়নকে স্থায়ী ধাতব ন্যানো পার্টিকেলে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, উদ্ভিদের নির্যাসের ঘনত্ব, ব্যবহৃত সিলভার লবণের অনুপাত এবং প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব ন্যানো পার্টিকেলের আকার ও গঠন নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যামোমাইল (Matricaria chamomilla) এবং ক্যালেন্ডুলা (Calendula officinalis) নামক উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করে একটি পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে যে, উৎপাদিত কণাগুলোর আকার ২ থেকে ৪০ ন্যানোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই কণাগুলোর ইলেকট্রন ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে এদের সিলভারের ফেস-সেন্টার্ড কিউবিক ল্যাটিস বা কেলাসাঙ্ক কাঠামোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

উচ্চমানের স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োজন এমন বাতাস পরিশোধন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই টেকসই সিলভার ন্যানো পার্টিকেলগুলো দীর্ঘমেয়াদী এবং কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখে। এই ন্যানো পার্টিকেলগুলো অণুজীবের কোষ প্রাচীরের সাথে সংযুক্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ব্যাহত করে, যার ফলে শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাল প্রভাব তৈরি হয়। এই কার্যকারিতা ইতিমধ্যে সার্জারি এবং দন্তচিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়েছে। ব্রাজিলের USP এবং UFSCar-এর বিজ্ঞানীদের এই চমৎকার উদ্ভাবন মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের জ্ঞানকে উন্নত ন্যানো প্রযুক্তির সাথে সমন্বিত করার মাধ্যমে শিল্প ক্ষেত্রে আরও নিরাপদ এবং দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করছে।

9 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • CPG Click Petróleo e Gás

  • Jornal da USP

  • NSC Total

  • Viletim

  • Revista Fórum

  • CPG Click Petróleo e Gás

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।