বিড়ালের প্রিয় সঙ্গী নির্বাচন: আচরণগত সংকেত ও মনস্তত্ত্ব
সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova
গৃহপালিত বিড়ালের মধ্যে এক অদ্ভুত দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়—তারা একদিকে যেমন স্নেহ চায়, তেমনই নিজেদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। কুকুরের থেকে ভিন্ন, বিড়ালরা অত্যন্ত বাছাই করে তাদের 'প্রিয় মানুষ' নির্বাচন করে। এই বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থা, অভ্যস্ত রুটিন এবং তাদের আবেগিক ও শারীরিক চাহিদা পূরণের ওপর ভিত্তি করে। বিড়ালের পছন্দের মানুষটিকে প্রভাবিত করে এমন কিছু মূল বিষয় রয়েছে, যা বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন।
বিড়াল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে তাদের মৌলিক চাহিদা, যেমন—খাবার প্রদান, খেলার মাধ্যমে উদ্দীপনা এবং সঠিক মাত্রার স্নেহ প্রদান করে, তাদের প্রতি বিড়াল বিশেষ মনোযোগ দেয়। বিড়ালরা তাদের সঙ্গীর কাছ থেকে সময় এবং তার গুণগত মানকে গুরুত্ব দেয়। স্বাধীনচেতা প্রাণী হওয়ায় বিড়ালদের ব্যক্তিগত পরিসর এবং নিরিবিলি সময় প্রয়োজন। জোর করে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করলে তাদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং তারা দূরে সরে যেতে পারে। তাদের সূক্ষ্ম শারীরিক ভাষা বুঝতে পারা এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা তাদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় নারীরা বিড়ালদের কাছে বেশি পছন্দের হয়ে ওঠে, যার সম্ভাব্য কারণ হলো নারীদের কণ্ঠস্বর সাধারণত শান্ত প্রকৃতির হয় এবং তাদের চালচলন অনেক বেশি কোমল হয়, যা বিড়ালের শান্ত পরিবেশের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিড়াল যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তার সবচেয়ে কাছের মনে করে, তখন তারা বেশ কিছু স্পষ্ট আচরণগত নিদর্শন প্রদর্শন করে, যা তাদের গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রমাণ দেয়। গভীর আস্থা প্রকাশের একটি শক্তিশালী চিহ্ন হলো পছন্দের মানুষের কাছাকাছি ঘুমানো, কারণ বিড়াল কেবল তখনই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয় যখন তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করে। যে ব্যক্তিকে তারা রক্ষক হিসেবে দেখে, তার কাছেই তারা বিশ্রাম নিতে পছন্দ করে। আরেকটি লক্ষণ হলো 'মাখন তৈরি করা' বা 'নিডিং' আচরণ, যা তাদের শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় এবং গভীর তৃপ্তি ও স্নেহের অনুভূতি প্রকাশ করে। এই ক্রিয়াটি নির্দেশ করে যে তারা সেই ব্যক্তিকে মাতৃসুলভ নিরাপত্তার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে।
তাদের পছন্দের মানুষের সাথে উষ্ণতা ভাগ করে নেওয়ার আরেকটি প্রকাশ হলো 'বন্টিং' বা গা ঘষা। এই প্রক্রিয়ায় বিড়াল তাদের মুখের ফেরোমোন চিহ্নিত করে, যার মাধ্যমে তারা সেই ব্যক্তিকে তাদের নিরাপদ অঞ্চলের অংশ এবং বিশ্বস্ত সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে। এছাড়াও, যখন তারা তাদের প্রিয় খেলনা সঙ্গে নিয়ে আসে, এটি খেলার আমন্ত্রণ এবং সম্পর্কের প্রতি তাদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। বিড়ালদের যোগাযোগের ধরনও পছন্দের মানুষের প্রতি ভিন্ন হয়; তারা বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে, যেমন—'মিয়াও', গরগর শব্দ বা ট্রিলিং, যা তাদের বিভিন্ন প্রয়োজন বা অনুভূতি প্রকাশ করে। বিড়ালদের এই স্বতন্ত্র অভিব্যক্তি এবং চাহিদার প্রতি মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বজুড়ে গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে বিড়াল ও কুকুর সবচেয়ে পরিচিত হলেও, তাদের মানুষের সাথে আচরণের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। যেখানে কুকুর তার মালিককে দেখলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, সেখানে বিড়াল প্রায়শই নির্লিপ্ত থাকে। তবে, গবেষকরা বলছেন, পরিচিত মানুষের সাথে তারা এতটাই মানিয়ে নিতে পারে যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বিড়ালদের পূর্বপুরুষরা একাকী শিকারী ছিল, যা তাদের স্বাধীনচেতা স্বভাবের মূল কারণ। এই সকল আচরণগত সংকেত অনুধাবন করতে পারলে মানুষের সাথে বিড়ালের সম্পর্ক আরও গভীর ও সন্তোষজনক হয়। তাদের ব্যক্তিগত সীমানাকে সম্মান জানানো এবং তাদের ভালোবাসার অনন্য প্রকাশগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়াই এই সুদৃঢ় বন্ধনের মূল ভিত্তি।
উৎসসমূহ
La Nacion
Así es como un gato elige a su persona favorita - LA NACION
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?
আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
