সাম্প্রতিক এক গবেষণায় কাঠঠোকরার কাঠ ঠোকরানোর তীব্র শক্তির নেপথ্যের জটিল পেশী সমন্বয় সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করা হয়েছে। এতদিন এই পাখিরা কীভাবে এত বল প্রয়োগ করে, তা নিয়ে জল্পনা থাকলেও, এখন বিজ্ঞানীরা তাদের শরীরের সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিউনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বন্য কাঠঠোকরাদের পেশী কার্যকলাপ এবং উচ্চ-গতির ভিডিও বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে যে ডাউনী কাঠঠোকরারা (Dryobates pubescens) কাঠ ঠোকরানোর সময় তাদের মাথা, ঘাড়, উদর এবং লেজের পেশীগুলিকে এমনভাবে ব্যবহার করে যাতে একটি দৃঢ়, হাতুড়ির মতো কাঠামো তৈরি হয়। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা তাদের আঘাতের শক্তিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো, কাঠঠোকরারা তাদের প্রতিটি আঘাতের সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দকে পুরোপুরি মিলিয়ে নেয়, অনেকটা ক্রীড়াবিদদের মতো যারা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সময় নিজেদের স্থির রাখতে শ্বাস ধরে বা ত্যাগ করে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে আঘাতের ঠিক মুহূর্তে পাখিরা সজোরে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, যা অনেকটা গোঙানির মতো শোনায়। এই শ্বাস-প্রশ্বাস-পেশী সমন্বয় তাদের দেহের মূল পেশীগুলিকে আরও শক্ত করে তোলে, যার ফলে প্রতিটি আঘাতের শক্তি বৃদ্ধি পায়।
গবেষকরা আরও দেখেছেন যে কাঠঠোকরারা প্রয়োজনীয় কাঠ কাটার তীব্রতা অনুযায়ী পেশী সংকোচনের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। যখন তারা জোরে কাঠ ঠোকরায়, তখন সামনের নিতম্বের ফ্লেক্সর পেশী আরও শক্তভাবে সংকুচিত হয়, যা জোরালো আঘাত নিশ্চিত করে। আবার, যখন তারা আলতোভাবে বার্তা পাঠানোর জন্য টোকা দেয়, তখন এই পেশীর সংকোচন শিথিল হয়। এই সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ তাদের কর্মক্ষমতার এক অসাধারণ দিক তুলে ধরে।
গবেষণায় আরও জানা যায় যে আঘাতের আগে মাথার গোড়ার তিনটি পেশী এবং ঘাড়ের পেশী মাথাকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। একই সাথে, উদরের পেশী ধড়কে স্থিতিশীল করে এবং লেজের পেশী আঘাতের মুহূর্তে একটি অ্যাঙ্কর বা নোঙরের মতো কাজ করে, যা পাখিকে গাছের গুঁড়ির বিপরীতে স্থির রাখতে সহায়তা করে। এই জটিল পেশীগুলির সম্মিলিত ক্রিয়াকলাপ তাদের শরীরকে একটি শক্তিশালী যন্ত্রে রূপান্তরিত করে, যা মস্তিষ্কের সুরক্ষার পাশাপাশি আঘাতের শক্তিকে নিরাপদে স্থানান্তর করতে সক্ষম।
এই ধরনের গবেষণার ফলাফল কেবল প্রকৃতির বিস্ময় উন্মোচন করে না, বরং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, কাঠঠোকরার মতো বল বিতরণ এবং পেশী সমন্বয়ের কৌশল অনুকরণ করে প্রকৌশলীরা নতুন ধরনের প্রভাব-শোষণকারী উপকরণ বা বায়ো-অনুপ্রাণিত রোবোটিক নকশা তৈরি করতে সক্ষম হতে পারেন, যা বারবার আঘাত সহ্য করতে পারে। এই পাখিরা প্রমাণ করে যে প্রকৃতির প্রতিটি কৌশলই নিছক শক্তি নয়, বরং সুচিন্তিত সমন্বয়ের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।




