পোষা প্রাণীর একঘেয়েমি: কেবল আচরণগত সমস্যা নয়, এটি গভীর মানসিক ভারসাম্যের প্রতিচ্ছবি
সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova
গৃহপালিত পশুদের মধ্যে একঘেয়েমি বা নিস্তেজতা কেবল তাদের মেজাজেই প্রভাব ফেলে না, বরং এটি তাদের সামগ্রিক সুস্থতা এবং পরিবারের সঙ্গে সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে পশুচিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। এই পরিস্থিতি প্রাণীর ভেতরের অস্থিরতা এবং চাপা হতাশার বহিঃপ্রকাশ, যা মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বাঁধনকে দুর্বল করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক ও সংবেদনশীল উদ্দীপনার অভাবই এই আচরণের মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞেরা, যেমন র্যা গেন ম্যাকগোয়ানের মতো ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন, প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন মানেই সে অবাধ্য হয়েছে এমনটা ভাবা ঠিক নয়; বরং এটি তার যোগাযোগের ভাষা এবং সাহায্যের আকুতি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মতো প্রাণীদের মধ্যেও উদ্বেগের কারণে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, যখন তারা নিরাপদ ও আদরে থাকে, তখন অক্সিটোসিন অর্থাৎ ভালোবাসার হরমোন তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এই মানসিক চাপ ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়।
বুদ্ধিমান প্রজাতি যেমন তোতা বা টিয়াপাখির মধ্যে দেখা যায় পালক ছিঁড়ে ফেলা বা একটানা তীব্র চিৎকার করার প্রবণতা, যা তাদের একাকীত্ব বা মানসিক অবসাদের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, বিড়ালরা আসবাবপত্র আঁচড়ানো বা নির্দিষ্ট স্থানে মলমূত্র ত্যাগ না করার মতো আচরণ করে। কুকুরদের ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করা, একটানা চিবানো বা ক্রমাগত মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এমনকি ছোট প্রাণী যেমন খরগোশ বা মাছের ক্ষেত্রেও পরিবেশের উদ্দীপনার অভাব দেখা দিলে তারা অলসতা বা গভীর মানসিক চাপে ভুগতে পারে। আমেরিকান ভেটেরিনারি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কুকুরের বিচ্ছিন্নতা-জনিত উদ্বেগের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল, যা মহামারি পরবর্তী সময়ে মানুষের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি স্পষ্ট করে যে, তাদের পরিবেশের পরিবর্তন সরাসরি তাদের ভেতরের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দেন যে কেবল খেলনা বা বস্তু যোগ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; প্রয়োজন প্রকৃত মিথস্ক্রিয়া। উদ্দীপনা কৌশলগুলি প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তিগুলিকে জাগিয়ে তোলার ওপর জোর দেয়। যেমন, বিড়ালদের জন্য এমন ফিডার ব্যবহার করা উচিত যা তাদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়, অথবা কুকুরদের জন্য গন্ধভিত্তিক ম্যাট এবং নিয়মিত অনুসন্ধানী হাঁটার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর ও তাদের মালিকদের হৃদস্পন্দন এবং স্ট্রেসের মাত্রা প্রায় একসঙ্গে ওঠানামা করে, যা তাদের গভীর আন্তঃসম্পর্ককে তুলে ধরে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৈনিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। পশুচিকিৎসা আচরণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই একঘেয়েমি কখনোই স্বাভাবিক বা নিরীহ নয়। বিড়ালদের জন্য দিনে কয়েকবার সংক্ষিপ্ত খেলার সেশন বা কুকুরদের জন্য নির্দিষ্ট মনোযোগের সময় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যখন আমরা এই লক্ষণগুলি শনাক্ত করে পরিবেশকে সক্রিয়ভাবে উন্নত করি, তখন কেবল তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যই সুরক্ষিত হয় না, বরং তাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে এবং যত্ন প্রদানকারী ও পোষ্যের মধ্যেকার বন্ধন আরও দৃঢ় ও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই যত্নশীল মনোযোগই তাদের ভেতরের স্বাভাবিক প্রবাহকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
উৎসসমূহ
infobae
The Washington Post
Infobae
Houston SPCA
Santévet
Petscare
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?
আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
